লকডাউনে সঙ্কটে ১৭২৪ প্রকল্প, কমেছে গতি

নিজস্ব প্রতিবেদক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৬:০১ PM, ০৫ মে ২০২১

করোনার প্রকোপ ঠেকাতে গত বছর প্রথম বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে অন্যান্য খাতের মতো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প। বিভিন্ন প্রকল্পের বিদেশি পরামর্শক-প্রকৌশলী-কর্মীদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়া, মালামাল আমদানি করতে না পারা, কর্মীদের করোনায় আক্রান্ত হওয়া, রিসোর্স স্থানান্তর করতে না পারাসহ নানা জটিলতায় পড়ে প্রকল্পগুলো। ফলে প্রকল্পের গতি মুখ থুবড়ে পড়ে। মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিতেও ধস নামে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছর করোনার মধ্যে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হয়। বাজেটে চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ১ হাজার ৭২৪টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এদিকে গত বছরই করোনার প্রকোপ কমতে শুরু করলে ফের গতি ফিরতে থাকে উন্নয়ন প্রকল্পে। সরকারসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ধারণা করেছিল, চলতি অর্থবছরে করোনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এতে গতি ফিরবে উন্নয়ন প্রকল্পে। কিন্তু চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলে ফের করোনার প্রকোপ বেড়ে যায়। করোনা নিয়ন্ত্রণে দ্বিতীয় দফায় বিধিনিষেধ তথা লকডাউন আরোপ করে সরকার। এক মাস ধরে চলছে সেই লকডাউন। কাজ বন্ধ না থাকলেও লকডাউনে সঙ্কটে পড়েছে ১ হাজার ৭২৪ উন্নয়ন প্রকল্প। সেই সঙ্গে চলতি অর্থবছরে যেসব নতুন প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে, সেসব প্রকল্পের অগ্রগতিতেও ভাটা পড়েছে।

ফলে চলতি অর্থবছরের শুরুতে জিডিপির যে প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা অর্জন করতে পারা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) জানিয়ে দিয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে তারা জিডিপির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল, তা অর্জন হবে না। এডিবি বলেছে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চললেও পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। আমরা যখন পূর্বাভাস দিয়েছিলাম, তখন এই দ্বিতীয় ঢেউয়ের কথা বিবেচনায় নেয়া হয়নি। ফলে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের ৬ দশমিক ৮ শতাংশ জিডিপি অর্জন হওয়ার যে পূর্বাভাস দিয়েছিলাম, তার থেকে কমপক্ষে ১ শতাংশ কম অর্জিত হতে পারে। এই অর্থবছরে বাংলাদেশে জিডিপি অর্জিত হতে পারে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ।

চলতি বছরের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো কী ধরনের সঙ্কটে পড়েছে, তা কিছুটা অনুধাবন করা যায় ১৭ এপ্রিল পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চীন সরকারের চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেডের (সিআরইসি) দেয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।

আন্তর্জাতিক ফ্লাইট স্থগিত করায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ ও অন্যান্য মেগা প্রকল্প উল্লেখ করে বিমান চলাচল পুনরায় চালুর দাবি জানিয়ে সিআরইসি বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প চীন ও বাংলাদেশের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ একটি যৌথ প্রকল্প। বর্তমানে পুরোদমে চলছে এই প্রকল্পের কাজ। তাই প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রায়শই ভ্রমণ করতে হচ্ছে। প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় ৩০ জন ব্যক্তিকে প্রতি সপ্তাহে চীন ও বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করতে হয়। যাদের মধ্যে রয়েছেন প্রকল্প পরিচালক, সুরক্ষা ও মান যাচাই এবং কারিগরি নির্মাণ কর্মকর্তাদের মতো মুখ্য পদে থাকা ব্যক্তিরা।

বৈশ্বিক মহামারির প্রাদুর্ভাবের কারণে প্রকল্প পরিচালনার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা এবং সাইটের শ্রম ব্যবস্থাপনা ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর এখন ফ্লাইট স্থগিতাদেশ নীতি প্রকল্পের অগ্রগতিকে আরও বাধাগ্রস্ত করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যদি চীন থেকে নির্মাণ স্থানে সময়মতো ফিরতে না পারেন। তবে বেশ কয়েকটি কাজের প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে এবং কিছু কাজ বাধ্য হয়ে স্থগিত করতে হবে। এটি নির্মাণের অগ্রগতিতে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বৈশ্বিক মহামারি থাকা সত্ত্বেও চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্যসহ অন্যান্য কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখ করে সিআরইসি বলেছে, বর্তমানে চীনে বৈশ্বিক মহামারি পরিস্থিতি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। চীন থেকে যেসব কর্মীরা বাংলাদেশে এসেছেন তারা সবাই দুই ডোজ টিকা গ্রহণ করেছেন। তাই তারা বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করবেন না।

একইসঙ্গে মুখ্য পদে থাকা ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সরকার যদি ভবিষ্যতে বাংলাদেশে ফিরে আসা চীনা কর্মীদের জন্য নির্ধারিত স্থানে সেন্ট্রালাইজড কোয়ারেন্টাইনের নীতিমালা তৈরি করে, তবে তারা আর বাংলাদেশে আসতে চাইবেন না। এই বিষয়গুলো প্রকল্পের অগ্রগতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মহামারি পরিস্থিতি অবনতির ফলে বিমান চলাচল স্থগিত করার কারণে চট্টগ্রামে প্রকল্পের জন্য অর্ডারকৃত ইস্পাত বিম, ইস্পাত বার ও ভূ-প্রযুক্তিগত সামগ্রী বহনকারী নৌযানের জট দেখা দিয়েছে। এছাড়াও, উচ্চ পোর্ট ডেমারেজ ফি, অতিরিক্ত পোর্ট স্টোরেজ চার্জ ও জ্বালানি চার্জ প্রকল্পটির মারাত্মক আর্থিক ক্ষতিসাধন করেছে। ইস্পাত বিম, রেল এবং আরও জিনিসপত্র আসতে বিলম্ব হয়েছে, যা প্রকল্পের সরঞ্জাম সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি চ্যালেঞ্জ ছিল।

চীন সংশ্লিষ্ট প্রকল্প ছাড়াও দেশের অন্যান্য প্রকল্পগুলোও প্রায় একই ধরনের সঙ্কটে রয়েছে বলেও ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী  বলেন, ‘সব প্রকল্প চলছে। সম্প্রতি ভ্যাকসিন নিতে গিয়ে নিউরোসায়েন্সে চলমান একটি প্রকল্পও দেখে এসেছি। তাতে দেখলাম ভৌত অগ্রগতি কম, কিন্তু কাজ বন্ধ নেই। সীমিত পরিসরে শ্রমিকরা কিন্তু পূর্ত কাজ করছে।’

সবমিলিয়ে করোনায় উন্নয়ন প্রকল্পের গতি কিছুটা কমেছে বলে মনে করেন আইএমইডি সচিব বলেন, ‘প্রকল্পের কাজের গতি করোনায় ব্যাঘাত তো অবশ্যই হয়েছে। কোনো সেক্টরতো বাদ নেই, সব সেক্টরেই করোনার প্রভাব পড়েছে। সামগ্রিকভাবেই এর প্রভাব পড়েছে। মানুষের মধ্যে ভীতি এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে রিসোর্স মবিলাইজেশন বা মানবসম্পদ মবিলাইজেশন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পণ্য পরিবহনে খুব একটা সমস্যা হয়নি। কারণ, প্ল্যান ছিল তো আগে থেকেই যে, ২০ টন রড লাগবে, এত ইট লাগবে। কিন্তু মানবসম্পদ মবিলাইজনের ক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যা হয়েছে। বিশেষ করে আমাদের যে শ্রমিক আছে, পরামর্শক সেবা আছে, এ খাতটা খুব আক্রান্ত হয়েছে। বিদেশি অনেকে আগেই চলে গেছেন, যাদের ফেরার কথা ছিল তারা আর ফিরে আসতে পারেননি।’

সম্প্রতি পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান  বলেন, ‘২০২০ সালে দেশে করোনা যখন প্রথম আঘাত এনেছিল, তখন অনেক বিদেশি শ্রমিক চলে যান। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের অনেকে দেশে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। তখন উন্নয়ন বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল। একদম বন্ধ হয়নি কিছুই। গতি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫ থেকে ৭ ভাগে নেমে গিয়েছিল। এখনতো পিকআপ (বৃদ্ধি) করছিলাম আমরা। তবে করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় আবার কিছুটা বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। এখনও আগের পর্যায়ে বাধা আসেনি। এখনও মোটামুটি স্পিড আছে। আমরা এটাকে ধরে রাখার চেষ্টা করবো। কিন্তু কাজ কোথাও বন্ধ হবে না। তবে নতুন প্রকল্প যেগুলো পাস হয়েছে মাত্র, তাদের মাঠে নামতে আগের তুলনায় একটু দেরি হতে পারে।’

আপনার মতামত লিখুন :