দূরপাল্লার বাস নিয়ে শেষ মুহূর্তে সবুজ সংকেতের আশা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০১:১৩ AM, ১২ মে ২০২১

ঈদের আগে শেষ মুহূর্তে দূরপাল্লার বাস চালানোর অনুমতি দেবে সরকার- এমন আশায় বুক বেঁধেছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। বাসগুলো ধোওয়া-মোছাসহ অন্যান্য কাজ সেরে নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি নিয়ে রাখছেন তারা।

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও বাংলাবাজার-শিমুলিয়া রুটে ফেরি চলাচলের অনুমতি দেওয়ার পর এমন আশা দেখছেন পরিবহন শ্রমিকরা। তারা বলছেন, বুধবার থেকে গ্রামের বাড়িতে যাওয়া মানুষের ঢল আরও বাড়বে। কারণ, ঈদের আগে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বুধবারই শেষ অফিস। তাই গত এক সপ্তাহে যত মানুষ গেছেন, সামনের দুই দিনে তার চেয়ে বেশি মানুষ গ্রামের বাড়িতে যাবে। এ ঢল সরকার থামাতে পারবে না। এ সুযোগে ছোট গাড়িগুলো ভাড়া আরও বাড়িয়ে দেবে, মানুষকে তখন আরও বেশি ভাড়া দিয়ে বাড়িতে যেতে হবে। তাই সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে হলেও দূরপাল্লার বাস চলার অনুমতি দেওয়া হোক।

মঙ্গলবার রাজধানীর মহাখালী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ঘুরে মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের এমন ভাবনার কথা জানা যায়।

দূরপাল্লার বাস চালুর অনুমতি দেওয়ার যুক্তি দিয়ে শ্রমিকরা বলছেন, যারা বাড়ি যেতে চাচ্ছেন তাদের কাউকে তো সরকার আটকে রাখতে পারেনি। সবাই যে যার মতো করে বাড়িতে গেছেন। এতে মানুষের দূভোর্গ আরও বেড়েছে। চার সিটের গাড়িতে আটজন, আট সিটের মাইক্রো বাসে ১৪-১৫ জন যাচ্ছেন। এতে স্বাস্থ্যবিধি যেমন মানা হচ্ছে না, তেমনি খরচও দ্বিগুণের বেশি হচ্ছে। অথচ দূরপাল্লার বাস এক সিট ফাঁকা রেখেও যদি চলার অনুমতি দেওয়া হতো তাহলে সাধারণ মানুষের কষ্ট কমতো এবং স্বাস্থ্যবিধিও মানা সম্ভব হতো।

শ্রমিকরা বলছেন, দক্ষিণ অঞ্চলের ফেরি বন্ধ করেও মানুষের ঘরে ফেরা ঠেকানো যায়নি। সরকার বাধ্য হয়ে ফেরি খুলে দিয়েছে। তাই এখনও সময় আছে মানুষকে কষ্ট না দিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দূরপাল্লার বাস চলার অনুমতি দেওয়া হোক।

ময়মনসিংহ হালুয়াঘাট রুটে ১৩ বছর ধরে বাস চালান সাইদুর রহমান। মঙ্গলবার সকালেও তাকে দেখা যায় মহাখালী বাস টার্মিনালে। বাস তো বন্ধ, তাহলে টার্মিনালে কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুনেছি দূরপাল্লার বাস চলার অনুমতি দেওয়া হবে, এজন্য এসেছি। খুব কষ্টে আছি, আপনাদের বোঝাতে পারব না। দু’মাস ধরে গাড়ি বন্ধ। একটা টাকা ইনকাম নাই। কীভাবে সংসার চলে কেউ খোঁজ নেয় না।

তিনি বলেন, সারা বছর চেয়ে থাকি ঈদে বাড়তি কয়েকটা টাকা ইনকাম করবো। কিন্তু গাড়িই চলছে না, ইনকাম আসবে কোথা থেকে। সরকার লকডাউন দিয়ে রাখছে। কিন্তু আমাদের কথা একবারও চিন্তা করল না। আমাদের এখন মাঠে মরার মতো অবস্থা।

তিনি সরকারের সিদ্ধান্তে সমালোচনা করে বলেন, লকডাউন কি শুধু গণপরিবহনের জন্য। সব কিছু চলছে, কোনো কিছু বন্ধ আছে? ঈদ আসছে, এখন পর্যন্ত একটা টাকা ইনকাম নেই। মালিককে দোষ দিয়ে লাভ কী? কারণ বাস না চললে মালিক আমাদের টাকা দেবে কোথা থেকে?

সাইদুর রহমান বলেন, দূরপাল্লার বাস বন্ধ থাকাতে সরকারের আরও ক্ষতি হয়েছে। করোনা আরও বাড়বে। কারণ, যারা বাড়িতে তারা গাদাগাদি করে যাচ্ছেন। কোথাও স্বাস্থ্যবিধি মান হচ্ছে না। ৮ সিটের এক মাইক্রোতে ওঠেন ১৪ জন, একজনের কাধেঁ উঠে আরেকজন যাচ্ছেন। এতে কি করোনা কমবে না বাড়বে?

এ বাসচালক আরও বলেন, একেকটি দূরপাল্লার বাসে ৫০টি সিট আছে। অর্ধেক সিট ফাঁকা রেখে যদি চলার অনুমতি দেওয়া হতো, তবে মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাড়ি যেতে পারতো। শুধু কি তাই? বিকল্প উপায়ে বাড়িতে যেতে মানুষের খরচ দ্বিগুণের বেশি হচ্ছে। তিনি বলেন, ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট পর্যন্ত একসিট ফাঁকা রেখে গেলেও বাসের ভাড়া পড়বে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা। কিন্তু যারা সিএনজি, মাইক্রোবাস বা অন্য মাধ্যমে বাড়িতে যাচ্ছেন তাদের ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে।

তাই আমাদের দাবি, সাধারণ মানুষ আর আমাদের পরিবহন শ্রমিকদের কথা চিন্তা করে ঈদের আগে দূরপাল্লার বাস চলার অনুমতি দেওয়া হোক। এতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে নিরপদে মানুষ বাড়িতে যেতে পারবে।

ঢাকা থেকে নেত্রকোনার বিরিশিরি রোডে চলে মা-মনি এটারপ্রাইজের বাস। এ পরিবহনের বাসগুলোও ধোয়া-মোছার কাজ চলছিল। তারা বলেন, মালিক বলেছে, সরকার বাস চলার অনুমতি দিতে পারে। তাই বাসগুলো রেডি রাখতে। এজন্য আজ সকাল থেকে বাসগুলো পরিষ্কারের কাজ শুরু করেছি।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, এ দাবি তো গত শনিবার আমরা করেছি। বলেছি, ঈদের কি পরিস্থিতি হবে তা আমাদের চেয়ে অন্যরা ভালো জানে না। আপনারা দেখছেন, মানুষ কীভাবে বাড়ি যাচ্ছে। কোথাও কোনো স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে? আমার দাবি, ঈদের এখনও দুই-তিন দিন বাকি আছে। অফিস,আদালত, শিল্প কারখানা, গার্মেন্টস খোলা হলে মানুষের উপচে পড়া ভিড় বাড়বে। তাই দূরপাল্লার বাস খুলে দেওয়া হোক।

এর আগে গত শনিবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদে দূরপাল্লার বাস চালুর দাবি জানান পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ও সংসদ সদস্য শাজাহান খান বলেন, ঈদে আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে দূরপাল্লার বাস চালাতে চাই। দাবি মানা না হলে সড়ক পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা ঈদের নামাজ শেষে নিজ এলাকার বাস ও ট্রাক টার্মিনালে সকাল ১০টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন।

আপনার মতামত লিখুন :