পতিতাবৃত্তির মোড়কে চলমান দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করো

শেখ মামুন সরওয়ার নিটু
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০২:৩১ PM, ০৭ জুন ২০২১

ছোটকালে রূপকথার গল্প পড়ার চেয়েও বেশী মজা পেতাম শুনে। সাধারণত রাতে অনেক শিশুকিশোর একসাথে বসে বা বিছানায় শোয়ার পর গল্পের আসর শুরু হতো।বড়রা আকর্ষনীয় ভঙ্গিতে গল্প বলতেন আমরা তন্ময় হয়ে শুনতাম ভুত-প্রেত,সুয়োরাণী দুয়োরাণী , সওদাগর, রাক্ষস খোক্কস,ব্যাঙ কুমার, ডালিম কুমার প্রভৃতি নানান কাহিনী।
রাজা-রাণী এবং রাজকুমার -রাজকন্যার বিলাসী জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলো দাসদাসী। তখন দাসদাসী মানে বুঝতাম পরিচারক ও পরিচারিকা যা এখনো অনেক ধনী পরিবারে বিদ্যমান। আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ(সাঃ) বলেছেন,তোমরা নিজেরা যা খাবে,পরবে দাসদাসীদেরও তেমন খাবার ও পোষাক দিবে। সঙ্গত কারণেই আমি ভাবতাম দাসদাসী হলো কাজের লোক এবং তাদের প্রতি সদয় আচরণ করা সভ্যতা ও মানবিকতার পরিচায়ক।
কিন্তু দাস (নারী পুরুষ উভয়েই) প্রথা সম্পর্কে যখন সত্যিটা জানলাম (১৯ শতকেও দাসপ্রথা বিদ্যমান ছিলো)তখন থেকে হতভাগ্য দাসদের অবর্নণীয় দূর্দশা ও পশুতুল্য জীবন আমাকে পীড়িত করে চলেছে।তখনকার সব বিখ্যাত মানব-মহামানব, মহান রাজা বাদশা, সম্রাট এদের কাউকেই আর মহান বলে মেনে নিতে পারিনা।
আপনি যে পরিবারের যে স্তরের মানুষ হোন না কেন, লুণ্ঠনকারী দল বা বিজয়ী নরপতি ও তার দল আপনাকে ধরে নিয়ে গিয়ে দাস বানাবে বা দাস হিসেবে বিক্রি করে দেবে আর আপনি হবেন ক্রেতার আমৃত্যু  গোলাম বা দাস।
দাসদের নিজস্বতা বলে কিছু ছিলোনা, মনিবের দাসকে নিয়ে যা খুশি করার অধিকার ছিলো।ইচ্ছে হলে হাত-পা, নাক-কান,গলা কাটতে বা যে কারো কাছে বিক্রি বা দান করার ক্ষমতা ছিলো এবং নতুন মনিবও সেই একই আচরণ করতে পারতো।
এটা ছিলো সেই সময়ের এক মহা মনুষ্যত্ব বিহীন কর্মকান্ড। দাস প্রথা কেন এতো দীর্ঘকাল যাবত প্রচলিত ছিলো? ছিলো কারণ দাস কেনাবেচার বাজার ছিলো। একশ্রেনীর মানুষ(?) পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নারী পুরুষ ধরে এনে বিক্রি করতো আর ধনী লোকেরা তাদের কিনতো বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করার জন্য। হয়তো দাসদাসীর সংখ্যা তাদের আভিজাত্য প্রকাশের নিয়ামক ছিলো।
এর মধ্যে নারী দাসদের অবস্থা ছিলো একেবারেই করুন।কর্তার ইচ্ছায় সব ধরনের কর্ম করতে তারা বাধ্য হতো। অপহৃত হওয়া কারো আদরের দুলালী মুহূর্তেই হয়ে যেতো অপরের ইচ্ছার সঙ্গীনি। আর সুন্দরী হলে তাকে একজীবনে অনেকবারই হয়তো নিলামে লোভাতুর পুরুষের কাছে বিক্রি হতে হতো,লোভের শিকার বনতে হতো বিনা আপত্তিতে।
দাস প্রথা বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে মনুষ্যত্বের চরম অপমান এই কেনা বেচার হাট বন্ধ হয়েছে। মানুষ বেঁচেছে চরম অবমাননাকর জীবন থেকে।
কিন্তু আসলেই কি বিলুপ্ত হয়েছে দাস প্রথা, মানুষ
কেনা-বেচা? না হয়নি, পতিতালয়ের নামে দাসপ্রথা এখনো চলমান। এখনো পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বড় আকারে নারী কেনা-বেচা বিদ্যমান। নানা ছলনায় দূবৃত্তরা এখনো নারীদের অপহরণ করে বিক্রি করে দিচ্ছে আর কিনছে যারা তারা সেই সব নারীদের মধ্যযুগীয় কায়দায় যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহৃত হতে বাধ্য করছে। অতীতের মতো বর্তমানের সব মহামানব, মহানায়ক, মানবতাবাদী,মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নোবেলজয়ী ব্যক্তি, সংগঠন সকলেই এই চলমান দাসপ্রথার সমর্থক।
একবিংশ শতাব্দীর এই সূবর্ন যুগে এসেও পতিতাবৃত্তি, পতিতালয় মেনে নেওয়া যায়না। এই প্রথা বন্ধ না করা পর্যন্ত পৃথিবীর মানুষ জাতি নিজেদের সভ্য বলে দাবী করার অধিকার রাখেনা। এই প্রথা বর্বরতা,সভ্যতা নয়।
পরিবারের কোন মেয়ে হারিয়ে গেলে সেই পরিবারে যে মানবিক বিপর্যয় ঘটে সেই পরিবারই জানে সেটা কী পরিমাণ মর্মপীড়াদায়ী।
একজন নারী যখন এই প্রথার শিকার হয়, তার অবর্ননীয় কষ্ট,অপমান মানবসভ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ
করে।এই বর্বর প্রথা অবিলম্বে বন্ধ করা হোক।

আপনার মতামত লিখুন :