টাঙ্গুয়ার হাওরে ছুটছেন পর্যটক

নিজস্ব প্রতিবেদক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০১:১১ AM, ১২ জুন ২০২১

দেশের অন্যতম পর্যটন এলাকা সুনামগঞ্জের তাহিরপুর। এখানে রয়েছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওর, শহীদ সিরাজ লেক (বাংলার কাশমির, সুইজারল্যান্ড ও নিলাদ্রী নামে পরিচিত), স্বচ্ছ নদী জাদুকাটার তীরে বড়গোপ টিলা। এটি বারেকের টিলা নামে পরিচিত। এখানে রয়েছে লাকমা ছড়া, চানপুর ঝরনা, শিমুল বাগান, শাহ্ আরেফীনের মাজার, অদ্বৈত মহাপ্রভুর মন্দির ও হলহলিয়ার রাজবাড়ি। আপনি চাইলে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে নৌকা দিয়ে এই সবগুলো এলাকাগুলো ঘুরে আসতে পারেন।

তবে বাউলসম্রাট আব্দুল করীমের গানের কথার মতো ঝিলমিল করা ‘ময়ূরপঙ্খী নাও’ না থাকলেও ঘোরার জন্য সেখানে রয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত বাহারি সব নৌকা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্ষা টাঙ্গুয়ার হাওরে ঘোরার উপযুক্ত সময়। টাঙ্গুয়া থেকে নৌকা করে সব পর্যটন এলাকায় সহজেই যাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে প্রথমে একটি ভালো নৌকা ভাড়া নিতে হবে। নৌকার চালকরা স্থানীয় বাসিন্দা হওয়ায় হাওরের প্রতিটি গ্রামের লোকজন তাদের পরিচিত। আর হাওরপাড়ের গ্রামের বাসিন্দারা সহজ-সরল ও অতিথিপরায়ণ।
তবে তাদের আত্মসম্মানবোধ আর ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রবল। পর্যটকদের সুবিধার্থে এসব এলাকায় নানা ধরনের কাজে স্থানীয়রা সম্পৃক্ত থাকেন। হাওরে ঘুরে বেড়ানো ও রাত্রিযাপনের একমাত্র ব্যবস্থা নৌযান হওয়ায় অনেক বাহারি ও বিলাসবহুল নৌযান গড়ে উঠেছে তাহিরপুর উপজেলায়। বিলাসবহুল অন্তত ২০টি নৌযান পর্যটকদের ভ্রমণকে নিরাপদ ও আনন্দময় করে।

এ ছাড়া ছোট-বড় আরও শতাধিক নৌযান রয়েছে পর্যটকদের নিয়ে হাওরে ভাড়ায় চালিত। স্টিল দ্বারা নির্মিত ছয়টি নৌযান তাহিরপুর উপজেলা সদর থেকে পর্যটকদের নিয়ে ঘুরতে যায় বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এ সংখ্যা আরও বেশিও হতে পারে। কয়েকটি নৌকায় পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা ও যোগাযোগের মোবাইল নম্বর দেওয়া হলো।

আবিদা অ্যান্ড তাহা টাঙ্গুয়া প্রমোদতরি
নৌযানটি ২০১৭ সালে তৈরি করেন তাহিরপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের রতনশ্রী গ্রামের আতাউর রহমান তালুকাদর। হাওর দেখতে আসা পর্যটকদের জন্য এটিই প্রথম বিলাসবহুল নৌযান। এতে করে দিনের বেলায় ১৫০ থেকে ২ শতাধিক পর্যটক ঘুরে বেড়াতে পারেন। তবে রাত্রিযাপনের জন্য ২২ জন পর্যটকের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্য ব্যবস্থা রয়েছে।

নৌযানটিতে আলাদা কেবিন আছে, যেখানে দুটি খাট আছে। আছে বালিশ, লেপ, তোশক ও মশারির ব্যবস্থা। নৌযানটিতে তিনটি টয়লেট রয়েছে। এর মধ্যে একটি হাই কমোড আর দুটি ফ্ল্যাট কমোড। ফ্ল্যাট কমোডের একটি নৌকার স্টাফদের জন্য। নিজস্ব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য আলাদাভাবে বেসিন দেওয়া আছে। বেসিন ও টয়লেটে পানি সরবরাহের জন্য ৩০০ লিটার পানি ধারণক্ষমতার ট্যাংক রয়েছে নৌযানটিতে। নৌযানের নিজস্ব মোটরে এই রিজার্ভ ট্যাংকিতে পানি ওঠানো হয়।

সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবাহের জন্য আইপিসের ব্যবস্থা রয়েছে। এর মাধ্যমে ল্যাপটপ, মোবাইল সবই চার্জ দেওয়া যায়। আর আলোর ব্যবস্থা তো আছে। আইপিএস নৌকার ইঞ্জিন থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চার্জ হয়ে থাকে। ইঞ্জিনের শব্দদূষণ ঠেকাতে থাই গ্লাস ব্যবহার করা হয়েছে। শক্তিশালী ইঞ্জিনে চলা নৌযানটিতে অটো গিয়ার রয়েছে।

নৌযানটির ছাদে একসঙ্গে দেড় শতাধিক লোক যেকোনো অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে পারে। পর্যটকদের সুবিধার জন্য পাচক ও রান্নার সুব্যবস্থা আছে। প্রতিটি নৌকাতেই হাই কমোড, লো কমোড, লেপ, তোশক, বালিশ ও মশারি রয়েছে। রয়েছে টাকা পরিশোধ সাপেক্ষে খাওয়া, গানের আয়োজন ও লাইফ জ্যাকেটের ব্যবস্থা।

নৌযানটি এক দিনের জন্য ভাড়া নিলে ১২ হাজার টাকা লাগবে। দুই দিন ও এক রাতের নিলে ১৮ হাজার টাকা লাগবে। সাধারণত তাহিরপুর উপজেলা সদর বাজার ঘাট বা থানা ঘাট থেকে যাত্রা শুরু হবে প্রথম দিন। টাঙ্গুয়ার হাওর পর্যটক টাওয়ারসহ আশপাশের এলাকা ঘুরে নৌকায় রাত্রিযাপন ট্যাকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্প ঘাট। এখান থেকেই শহীদ সিরাজ লেক, লাকমা ছড়া হেঁটেই স্বাচ্ছন্দ্যে দেখা যায়। তবে চানপুর ঝরনা, বড়গোপ টিলা, যাদুকাটা নদী ও শিমুল বাগান যেতে হলে মোটরবাইক বা অটোতে করে যেতে হবে। রান্না ও গানের জন্য আলাদা অর্থ খরচ করতে হবে। আবিদা অ্যান্ড তাহা টাঙ্গুয়া প্রমোদতরি ভাড়ার জন্য যোগাযোগ : ০১৭৩৩১৭২৪৫৮।

সিন্দাবাদ তরি
এ নৌযানটি আকর্ষণীয়। এতে রয়েছে জেনারেটর-সুবিধা। ফ্যান চলে ৬টি। একসঙ্গে মোবাইল চার্জ দেওয়া যায় ২০টি। বৃষ্টি বা যেকোনো দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ২৪ জন পর্যটকের রাত্রিযাপনের সুবিধা আছে। স্বাচ্ছন্দ্যে ১৮ জন রাত্রিযাপন করতে পারে। রয়েছে বেসিন, হাই কমোড ও ২ লো কমোডের টয়লেট। দুই রাত এক দিনের নৌকাটি ভাড়া নিলে ২৪ হাজার টাকা লাগবে। এই প্যাকেজটি নিলে পর্যটকদের খাবার ও বাবুর্চির জন্য আলাদা কোনো টাকা দিতে হবে না। তবে এক দিনের জন্য লাগবে ১৭ হাজার টাকা। যোগাযোগ এমরান : ০১৬৭৩ ১১১২৩৭।

টাঙ্গুয়া নৌপরিবহন
এই নৌযানটিতেও একই ধরনের সুবিধা রয়েছে। রাতের বেলায় ২৪ জন পর্যটকের থাকার সুব্যবস্থা আছে। দুই দিন, এক রাতের জন্য ১৪ থেকে ১৬ হাজার টাকা। আর এক দিনের জন্য ভাড়া ৬ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকা। যোগাযোগ সামায়ূন কবীর : ০১৭১২১৪৩৭৫৩।

মোহনা নৌপরিবহন
একই সুবিধা রয়েছে এটিতে। তবে ফ্যান আছে ৩টি। চলে আইপিএসে। বেসিন, হাই কমোড, লো-কমোড সুবিধা প্রতিটি নৌকার মতো এখানেও আছে। দিনের বেলায় এটিতে ১০০ জন পর্যটক ঘুরতে পারে। তবে স্বাচ্ছন্দ্যে ২০- ২৫ জন রাত্রিযাপন করতে পারে। ভাড়া দুই দিন এক রাতের জন্য ভাড়া ২০ হাজার টাকা। আর এক দিনের জন্য ভাড়া পড়েব ১০ হাজার টাকা। যোগাযোগ আলম : ০১৭১৪৩৬৫০১২।

মুক্তা মণি নৌপরিবহন
একই ধরনের সুবিধা থাকলেও নেই হাই কমোড। নেই মোবাইল চার্জের ব্যবস্থা। গ্যাস বিল বাবুর্চির খরচ নৌকার কর্তৃপক্ষ বহন করবে। নৌকাতে রাতের বেলায় ১২ জন পর্যটক থাকতে পারে। দুই দিন এক রাতের ভাড়া ১২ হাজার টাকা। আর এক দিনের জন্য ভাড়া ৫ হাজার টাকা। যোগাযোগ পরাণ আখঞ্জি : ০১৭১৮১৬৮৩১৪।

যেভাবে আসবেন
ঢাকার সায়দাবাদ, ফকিরাপুল বা অন্য কোনো বাসস্টেশন থেকে প্রতিদিন শ্যামলী ও মামুন পরিবহন এবং মহাখালী থেকে এনা পরিবহনের বেশ কটি ডে-নাইট বাস সরাসরি সুনামগঞ্জ আসে। ভাড়া ৫৫০ থেকে ৭৫০ (এসি বাস) টাকা। এখন করোনাকালীন সময়ের জন্য একটু বেশি রয়েছে বাস ভাড়া। দিনের বেলায় ৬-৭ ঘণ্টার বাস ভ্রমণ করে সুনামগঞ্জ জেলা শহরে এসে যেকোনো হোটেল, কটেজ বা সরকারি-আধা সরকারি রেস্ট হাউসে রাত্রিযাপন করা যায়। আবার রাতের বাসে উঠলে ভোরে পুরাতন বাসস্টেশনের কোনো রেস্তোরাঁয় নাশতা সেরে আগে থেকে কথা বলে রাখা মাইক্রোবাস-কার বা পুরাতন বাসস্টেশন থেকে আব্দুজ জহুর সেতু পর্যন্ত রিকশায় গিয়ে অন্য কোনো যানবাহনে (সিএনজি বা মোটর সাইকেলে) তাহিরপুর যেতে পারেন।

ভ্রমণ-পরিকল্পনা
যদি টাঙ্গুয়ার হাওরে দুই দিনের ভ্রমণসূচি গ্রহণ করা যায়, তাহলে হাওরকে ভালো করে দেখার সুযোগ পাওয়া যাবে। সে ক্ষেত্রে রাত্রিযাপন করতে হবে হাওরের ভেতরে বা পাশের কোনো গ্রামে। যদি হাওরের ভেতরে থাকতে চান, তবে নৌকায় থাকা সবচেয়ে রোমাঞ্চকর। রান্নার জন্য ট্যুর গাইডের সাহায্য নিতে পারেন। হাওরের টাটকা মাছ অথবা হাঁসের ডিম এখানে সহজেই পাওয়া যায়। মোরগ বা সবজি কিনতে পাবেন। হাঁড়ি-পাতিল তাহিরপুর বাজারের যেকোনো ডেকোরেটর থেকে ভাড়ায় নিয়ে আসতে পারেন। তবে নৌকায় যারা থাকবেন, তারাই এগুলোর ব্যবস্থা করে।

প্রথমে তাহিরপুর বাজার থেকে নৌকা করে টাঙ্গুয়ার হাওরে আসবেন। সেখানে ওয়াচ টাওয়ারের কাছে সময় কাটাতে পারেন। এখানে স্বচ্ছ নদীতে গোসল করতে পারবেন। এ জায়গা থেকে টাকেরঘাট আসতে পারেন। এখানে শহীদ সিরাজ লেক (নিলাদ্রী)সহ আশপাশের এলাকা ঘুরতে পারেন। এখান থেকে চাইলে মোটরসাইকেল করে বড়গোপ টিলা (বারেকের টিলা) আসতে পারেন। টিলার নিচেই রয়েছে জাদুকাটা নদী। পাশেরই শিমুল বাগান।

মোটরসাইকেল করে বড়গোপ টিলায় না আসতে চাইলে সরাসরি নৌকা নিয়েও আসা যায়। এ ক্ষেত্রে মাঝিকে অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হতে পারে। রাতে সুবিধামতো জায়গায় থাকবেন। তবে সবচেয়ে নৌকায় টাঙ্গুয়ার হাওরে থাকলে ভালো হয়। ভ্রমণ শেষ করে সন্ধ্যায় তাহিরপুর থেকে সুনামগঞ্জ ফিরতে পারেন। পরে রাতের বাসে ঢাকায় ফিরতে পারবেন।

আপনার মতামত লিখুন :