দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য সিআরবি:ডিটিও-রেজার গোপন তথ্য ফাঁস

নিজস্ব প্রতিবেদক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৭:৩৫ PM, ১৩ জুলাই ২০২১

দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য হিসেবে আলোচনা-সমালোচনার শীর্ষে রয়েছে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রাম (সিআরবি)। চলতি সময়ে ডিটিও স্নেহাশীষ দাস গুপ্ত এবং সিসিএম দপ্তরের উচ্চমান সহকারী রেজা হায়দারের দুর্নীতির গোপন তথ্য ফাঁস করেছে ঠিকাদার এবং তার দপ্তরের সংশ্লিষ্টরা। তারা জানান,রেজা ঠিকাদারদের বিল প্রদানের ক্ষেত্রে বাণিজ্য না হলে বিল ঝুলে থাকে। অন্যদিকে ডিটিওকে ঘুষ না দিলে মিলে না সরকারি বাসা বরাদ্দ। করোনাকালিন সময়ে থেমে নেই পোস্টিং বাণিজ্য।

আর্থিক সুবিধা নিয়ে ৮জনকে তাদের সুবিধাজনক স্টেশনে পোস্টিং করা হয়েছে। এসব অপকর্মের মূলহোতা ডিটিএনএল খোকন। ষোলশহর স্টেশন গেট ঘরের আশপাশে যত অবৈধ দোকানপাট রয়েছে তাদের কাছ থেকে মাসোয়ারা আদায় করে ডিটিও’র ভাগিনা ষোলশহরের সহকারী স্টেশন মাস্টার তমাল। স্নেহাশীষের মোটা অংকের মাসোয়ারা আসে সেখান থেকে। এমন নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে তাদের বিরুদ্ধে। কোরাপশনের ঘাঁটি অবস্থিত পাহাড়ের উঁচু চুড়ায়। চারিপাশে বৃক্ষলতায় ঘেরা। আলো-আঁধারে সিআরবির এই ভবনে নিরবে চলে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি। যা দেখার কেউ নেই। বিগত বছরের হিসেব পরিসংখ্যানে দেখা যায় রেলওয়ের যন্ত্রাংশ কেনাকাটা,টেন্ডার বাণিজ্য, নিয়োগে ঘুষ,বদলিতে উৎকোচ,সম্প্রতি শ্রমিকদের পোশাক তৈরীর নামে অর্থ আত্মসাতসহ সকল ক্ষেত্রে দুর্নীতি।

উল্লেখ্য,ডিটিও স্নেহাশীষের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ গত মে মাসে ৩১জন গার্ডকে প্রশিক্ষণ বাবদ জনপ্রতি ৫০ হাজার করে ঘুষ নিয়ে চট্টগ্রাম হালিশহর ট্রেনিং একাডেমিতে পাঠানো হয় বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ট্রেনিং শেষে গত জুন মাসে তাদের সার্টিফিকেট দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন রেক্টর মনির চৌধুরী।

এছাড়া ডিটিওর অধিনে সকল কর্মচারীদের সরকারি বাসা বরাদ্দ নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহনের অভিযোগও কম নয়। উৎকোচ ছাড়া তিনি কোন কাজ করেন না বলে দাবি কর্মচারীদের। বাসা বরাদ্দ নেয়ার ক্ষেত্রে কর্মচারীদের গুণতে হয় মোটা অংকের টাকা। অর্থ ছাড় দিলে মিলে বাসা না দিলে ঘুরতে হয় দীর্ঘদিন।

অন্যদিকে ট্রেনিং একাডেমির সিনিয়র ট্রেনিং কর্মকর্তা ট্রাফিক(এসটিআরওটি) মো.আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে টিকেট কালোবাজারির অভিযোগ রয়েছে। তিনি ২০১৬ সাল থেকে ১৯ সাল পর্যন্ত সিলেট এবং চট্টগ্রামের স্টেশন ম্যানাজারের দায়িত্ব পালনকালে ট্রেনের টিকেট ব্ল্যাকার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। পরে তাকে হালিশহরে ট্রেনিং একাডেমির দায়িত্ব দেয় রেলপথ মন্ত্রণালয়।

প্রসঙ্গগত,রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ কমার্শিয়াল (সিসিএম) অফিসের কর্মচারী রেজা হায়দারের গ্রীণ সিগনালে মিলে রেলের ঠিকাদারদের বকেয়া বিল। বরাদ্দ আসে ঠিকই। কিন্তু সে বরাদ্দ অনুযায়ী দেয়া হয় না ঠিকাদারদের পাওনা টাকা। তাই কাজ করে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয় তাদের। আবার এক খাতের বিল চলে যায় অন্যখাতে। তবে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারের বকেয়া হাতে হাত মিলালেই হয়ে যায়। এই অফিসের উচ্চমান সহকারীর দাপটে বিল নিয়ে চলছে এমন তুলকালাম। রেজাই সিসিএম অফিসের একপ্রকার হর্তাকর্তা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার অভিযোগ করেন, রেজা ১০ বছর যাবত এই দপ্তরে এককভাবে দাপটের সাথে কমিশন বাণিজ্য করে যাচ্ছে। অফিসে তার কথাই শেষ কথা। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তার ইচ্ছাতেই বরাদ্দ ঢেলে সাজায় বিভিন্ন খাতে।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, রেজার আশীর্বাদ পেলে মিলে ঠিকাদারদের কাজের বিল। ডিসকাউন্ট না দিলে বিল-ভাগ্যের চাকা বন্ধ থাকে।

রেলওয়ের সিসিএম অফিস সূত্র জানায়, আইবাস সিস্টেম কোড ২৮০১ খাতে সাধারণ প্রশাসনের অনুকূলে রিভার্স বাজেটে মেরামত খাতসহ বিভিন্ন খাতে চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজারের (পূর্ব) অনূকূলে থেকে বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়। গত বছরের মার্চ মাসেই বরাদ্দ আসে আড়াই কোটি টাকা।

এই দফতরের মাধ্যমে বিভাগীয় বাণিজ্যিক দফতর ঢাকা ও চট্টগ্রাম খাতে অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার কথা থাকলেও তা নিয়ম অনুযায়ী বণ্টন না করে উচ্চমান সহকারী রেজা আটকে রাখেন বলে অভিযোগ তুলে ঠিকাদাররা। তাদের দাবি, আড়াই কোটি টাকা বরাদ্দ এলেও তা দফতরগুলোতে পোস্টিং না দিয়ে আটকে রেখে কমিশন আদায় করছে উচ্চমান সহকারী।

অথচ নথি অনুযায়ী ২০২০-২১ অর্থ বছরে অফিস কম্পিউটার মেরামত বাবদ ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দের তথ্য পাওয়া গেছে।
২০২০-২১ অর্থ বছরে অফিস আসবাব মেরামত বাবদ ২৪ লাখ, কম্পিউটার মেরামত খাত ৭লাখ ৫০ হাজার, অফিস সরঞ্জামাদী ক্রয় বাবদ ১৫ লাখ, আসবাবপত্র বাবদ ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ আসার সত্যতা মিলেছে। এ ছাড়া ৩২৫৫১০৫ কোড বাবদ বরাদ্দ আসে ৪৬ লাখ টাকা।

অভিযোগের সত্যতা জানতে সিসিএম মো.নাজমুল ইসলামের নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। বিল-বাণিজ্যের বিষয়ে রেজা হায়দার বলেন,বরাদ্দ আসে কর্তাদের কাছে আমি শুধু বিতরণ করি। ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগ ভিত্তিহীন। ডিটিও পোস্টিংএর বিষয়ে বলেন,অনেকে ছিক ছুটিতে যায় সেই শূন্য পদ পুরোনে বদলি করা হয়। বাসা বরাদ্দ এবং গার্ডদের ট্রেনিংএ ঘুষের অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন তিনি। স্নেহাশীষ দাস গুপ্ত বলেন,চাকরির ৩৮ বছর বয়সে আমার কোন অভিযোগ নেই।

রেলওয়ের মহাপরিচালক ডিএন মজুমদার বলেন,অভিযোগ প্রমানিত হলে তাঁর বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। আইনের উর্দ্ধে কেউ নয়। জিএম জাহাঙ্গীর হোসেনের সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। তিনি ফোন ধরেননি।

আপনার মতামত লিখুন :