ডিজিটাল বাংলাদেশের মহাসড়ক হবে ফাইভ-জি

নিজস্ব প্রতিবেদক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১১:৩৩ AM, ১৩ অক্টোবর ২০২১

ফাইভ-জি যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে দেশ। প্রযুক্তির এ উৎকর্ষে শিল্পবিপ্লবে আসবে গতি। আস্থা বাড়বে বিনিয়োগেও। জীবন ধারায় দেখা দেবে আমূল পরিবর্তন। প্রয়োজনীয় যেকোনো চাহিদার বিপরীতে কাজ করবে প্রযুক্তি। সবমিলিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশের মহাসড়ক হবে এ ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক— এমনটি বলছেন প্রযুক্তিবিদ এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার  বলেন, ফাইভ-জি ডিজিটাল যুগের ডিজিটাল কানেকটিভিটি (সংযোগ) তৈরি করবে। এ কানেকটিভিটির ওপর নির্ভর করে সবধরনের শিল্পবিপ্লবের মহাসড়ক হবে ফাইভ-জি। একটা বিষয় খুব স্পষ্ট করে বোঝা দরকার যে ফাইভ-জি একটা সাধারণ মোবাইল প্রযুক্তি নয়। আমরা সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনে যেভাবে মোবাইলের ব্যবহার করি সেই বিষয়টি ফাইভ-জির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।

একটা বিষয় খুব স্পষ্ট করে বোঝা দরকার যে ফাইভ-জি একটা সাধারণ মোবাইল প্রযুক্তি নয়। আমরা সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনে যেভাবে মোবাইলের ব্যবহার করি সেই বিষয়টি ফাইভ-জির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফোর-জির গতি হলো চার এমবিপিএস পর্যন্ত। আর ফাইভ-জির গতি হবে কমপক্ষে ২০ এমবিপিএস থেকে সর্বোচ্চ ১০০ এমবিপিএস পর্যন্ত। সুতরাং এখানে চার থেকে পাঁচগুণ গতি বাড়বে। প্রযুক্তিতে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাবে। ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি সুফল পাবেন।

ফাইভ-জির ফলে কোন কোন জায়গায় পরিবর্তন আসতে পারে— এমন প্রশ্নের জবাবে প্রযুক্তির পুরোধা মোস্তাফা জব্বার বলেন, প্রধানত যে জায়গায় পরিবর্তন হবে সেটা হলো নতুন যেসব প্রযুক্তি আসছে সেসব প্রযুক্তির বাহক হবে ফাইভ-জি। দ্বিতীয়ত, জীবনধারার আমূল পরিবর্তন হবে। শিল্প, কলকারখানা, ব্যবসা, কৃষি, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তাসহ যা আছে সবকিছুর ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন হবে ফাইভ-জির মাধ্যমে।

পৃথিবীর অল্প কয়েকটি দেশে ফাইভ-জি প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশ সেসব দেশের মধ্যে একটি হতে যাচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের মহাসড়ক হবে ফাইভ-জি। এর মাধ্যমে একটি নতুন সভ্যতা দেখবে জাতি
মোস্তাফা জব্বার, ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী
এটির প্রয়োগ কেবলমাত্র শুরু হয়েছে। আমরা অতীতের প্রযুক্তিগুলো সঠিক সময়ে গ্রহণ করতে পারিনি বলে প্রথম তিন শিল্পযুগ আমরা মিস করেছি। এখন আর পিছিয়ে থাকব না— যোগ করেন তিনি।

মোস্তাফা জব্বার বলেন, পৃথিবীর অল্প কয়েকটি দেশে ফাইভ-জি প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশ সেসব দেশের মধ্যে একটি হতে যাচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের মহাসড়ক হবে ফাইভ-জি। এর মাধ্যমে একটি নতুন সভ্যতা দেখবে জাতি।

২০২২ সালের মধ্যে সারাদেশ কি ফাইভ-জি নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে— এমন প্রশ্নের জবাবে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী বলেন, ‘আমি মনে করি না ২০২২ সালে পুরো দেশে ফাইভ-জি নেটওয়ার্কের প্রয়োজন পড়বে। মনে রাখতে হবে, এটি টু-জি, থ্রি-জি, ফোর-জি নেটওয়ার্কের মতো নয়। ফলে আমাদের বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে যে কোন কোন এলাকায় ফাইভ-জির চাহিদা রয়েছে।

ফাইভ-জি নেটওয়ার্কের কাভারেজ সম্পর্কে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় জানায়, ইকোনমিক ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল জোন যেগুলো হচ্ছে সেগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক দেওয়া হবে। এসব এলাকায় যদি কেউ ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক চায় তাদের দেওয়া হবে।

পরিবহন ব্যবস্থা, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং, ওয়্যারলেস রোবোটিক্স, এইচডি মানের সিসিটিভি, স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং, বিমান ও স্মার্ট কারখানা পরিচালিত হবে ফাইভ-জি মাধ্যমে
ফাইভ-জি বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ

ফাইভ-জি বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে মোস্তাফা জব্বার বলেন, যেহেতু নতুন প্রযুক্তি এটি এবং এটি যেহেতু কথা বলার প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না, সেহেতু এর প্রয়োগের জন্য আমাদের পুরো সমাজের যে সচেতনতা দরকার, সেই জায়গায় বড় সহযোগিতার প্রয়োজন পড়বে। যেহেতু এখানে সবকিছুর পরিবর্তন হবে সেহেতু চ্যালেঞ্জও বড় হবে। এটি আমরা মোকাবিলা করতে চাই।

স্পেকট্রামে বাংলাদেশের প্রস্তুতি সম্পর্কে মন্ত্রী  বলেন, আমরা এ বছরে টেলিকম প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে স্পেকট্রাম দেওয়ার জন্য নিলামের ব্যবস্থা করব। স্পেকট্রামের কোনো ঘাটতি নেই দেশে। আমরা সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত।

ফাইভ-জিতে যেমন সম্ভাবনা আছে, ঠিক তেমনি চ্যালেঞ্জও রয়েছে। তবে একটা না একটা সময়ে কিন্তু এ প্রযুক্তিতে প্রবেশ করতেই হবে বাংলাদেশকে। সেটা যত আগে হবে ততই ভালো। তবে থ্রি-জি, ফোর-জি নেটওয়ার্কেও গুরুত্ব দিতে হবে

জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রফেসর ড. মো. ফরহাদ হোসাইন  বলেন, ফাইভ-জি নেটওয়ার্কে যুক্ত হলে অনেক বড় পরিবর্তন আসবে দেশে। নতুন নতুন অ্যাপ্লিকেশন যোগ হবে। এতে নতুন মেশিন টু মেশিন ও আল্ট্রা রিয়েবল লো লোটেনসি কমিউনিকেশন অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করা সম্ভব হবে। ফলে শিল্পবিপ্লবে অনেক সহায়ক হবে ফাইভ-জি।

এ প্রযুক্তিবিদ মনে করেন, ফাইভ-জিতে যেমন সম্ভাবনা আছে, ঠিক তেমনি চ্যালেঞ্জও রয়েছে। তবে একটা না একটা সময়ে কিন্তু এ প্রযুক্তিতে প্রবেশ করতেই হবে বাংলাদেশকে। সেটা যত আগে হবে ততই ভালো। তবে থ্রি-জি, ফোর-জি নেটওয়ার্কেও গুরুত্ব দিতে হবে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, আগামী ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝিতে সরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠান টেলিটকের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে দেশে ফাইভ-জি নেটওয়ার্কের উদ্বোধন করা হবে। ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলক কাজ শুরু হয়েছে।

আগামী ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝিতে সরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠান টেলিটকের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে দেশে ফাইভ-জি নেটওয়ার্কের উদ্বোধন করা হবে। ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলক কাজ শুরু হয়েছে

ফাইভ-জির ফলে কোন কোন ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে— জানতে চাইলে টেলিকম রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ’র (টিআরএন,বি) সাধারণ সম্পাদক সমীর কুমার বলেন, ২০২৫ সালের মধ্যে বেশকিছু অ্যাপ্লিকেশন ফাইভ-জি নির্ভর হবে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- পরিবহন ব্যবস্থা, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং, ওয়্যারলেস ই-হেলথ, ওয়্যারলেস রোবোটিক্স, এইচডি মানের সিসিটিভি (১০ জিবি প্রতিদিন), স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং (ফোর টিবি প্রতিদিন), বিমান ও স্মার্ট কারখানা। এসব অ্যাপ্লিকেশন পরিচালনায় বড় পরিবর্তন আসবে।

দেশে ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক স্থাপনে টেলিকম রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ’র পক্ষ থেকে বেশকিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো- আইসিটি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি কার্যকর প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগ দেওয়া।

২০২৫ সালের মধ্যে বেশকিছু অ্যাপ্লিকেশন ফাইভ-জি নির্ভর হবে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- পরিবহন ব্যবস্থা, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং, ওয়্যারলেস ই-হেলথ, ওয়্যারলেস রোবোটিক্স, এইচডি মানের সিসিটিভি (১০ জিবি প্রতিদিন), স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং (ফোর টিবি প্রতিদিন), বিমান ও স্মার্ট কারখানা। এসব অ্যাপ্লিকেশন পরিচালনায় বড় পরিবর্তন আসবে
সমীর কুমার, সাধারণ সম্পাদক, টেলিকম রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ
জাতীয় ব্রডব্যান্ড পরিকল্পনার সুপারিশে বলা হয়েছে, একটি সমন্বিত জাতীয় ব্রডব্যান্ড পরিকল্পনা করতে হবে। যেখানে টাওয়ার অবকাঠামো, গ্রিন অ্যানার্জি, স্পেকট্রাম রোডম্যাপ, ফোর-জি/ফাইভ-জি কাভারেজ কার্যকরে ইকোসিস্টেমের রূপরেখা সুনির্দিষ্ট থাকবে।

স্পেকট্রাম নীতিমালার সুপারিশে বলা হয়েছে, টেলিযোগাযোগ বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত স্পেকট্রাম নিশ্চিতের জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে। বিশেষ করে 2.3GHz/2.6GHz/3.5GHz/700MHz এবং ভবিষ্যতের 6GHz বিবেচনা করে অর্থাৎ ভবিষ্যতের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজন মেটানোর বিষয়টি সুস্পষ্ট রেখে স্পেকট্রাম রোডম্যাপ পরিকল্পনা নিতে হবে।

সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিতে সুপারিশে বলা হয়েছে, টেলিকম সরঞ্জাম সুরক্ষা থেকে শুরু করে নেটওয়ার্ক কিউএস পরিচালনা পর্যন্ত ভবিষ্যতের নেটওয়ার্ক বিকাশ ও বিবর্তনের জন্য নীতি এবং মানদণ্ড স্থাপনের মাধ্যমে সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিতের পদক্ষেপ নিতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন :