প্রশিক্ষণ একাডেমির ৭০০ একর ভূমি বরাদ্দে স্থগিতাদেশ ঠেকাতে তোড়জোড়

নিজস্ব প্রতিবেদক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১২:১৪ PM, ১৪ অক্টোবর ২০২১

সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ একাডেমি নির্মাণের লক্ষ্যে কক্সবাজারে সংরক্ষিত বনভূমির ৭০০ একর জায়গা বরাদ্দের স্থগিতাদেশ ঠেকাতে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। হাইকোর্টের আদেশ প্রত্যাহারে আবেদন করে সাড়া না পেয়ে আপিলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ১১ অক্টোবর সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ একাডেমি নির্মাণের লক্ষ্যে কক্সবাজারে সংরক্ষিত বনভূমির ৭০০ একর জায়গা বরাদ্দের সিদ্ধান্ত স্থগিত করেন হাইকোর্ট। পরদিনই হাইকোর্টের আদেশ প্রত্যাহার চেয়ে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। কিন্তু আদালত কোনো সাড়া দেননি।

এ বিষয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার  বলেন, গত ১২ অক্টোবর আমরা হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার চেয়ে আবেদন করেছিলাম। কোর্টকে বলেছি, এ রিট মামলার নোটিশ অন্য কোর্টে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মামলাটা আপনার আদালতে করা হয়েছে। নোটিশ যথাযথভাবে সার্ভ হয়নি। রিট মামলাটি পুনরায় শুনানি করার জন্য অনুরোধ করেছিলাম এবং আদেশ প্রত্যাহারের আবেদন করেছিলাম। তখন আদালত বলেছেন, আমরা তো আদেশ দিয়েছি। এ আদেশ এখন আর প্রত্যাহার করব না।

এদিকে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারে হাইকোর্টের সাড়া না পেয়ে আপিলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এস এম মুনীর  বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ একাডেমি নির্মাণের লক্ষ্যে কক্সবাজারে সংরক্ষিত বনভূমির ৭০০ একর জায়গা বরাদ্দের সিদ্ধান্ত স্থগিত করে দেওয়া হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আমরা আপিল করব। আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করার জন্য অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড নিযুক্ত করে দিয়েছি।

গত ১১ অক্টোবর সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ একাডেমি নির্মাণের লক্ষ্যে কক্সবাজারে সংরক্ষিত বনভূমির ৭০০ একর জায়গা বরাদ্দ স্থগিত করেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে ওই বরাদ্দ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন আদালত।

এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিঞা ও বিচারপতি মো. কামরুল হোসেন মোল্লার হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনিরুজ্জামান কবির।

চার সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, পরিবেশ ও বন সচিব, ভূমি সচিব ও জনপ্রশাসন সচিবকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

গত ৫ সেপ্টেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে ‘৭০০ একর বনভূমি প্রশাসন একাডেমির জন্য বরাদ্দ’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আরেকটি প্রশিক্ষণ একাডেমি নির্মাণ করতে ‘সংরক্ষিত বনভূমির’ ৭০০ একর জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন ঝিলংজা বনভূমির ওই এলাকা প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন।

বন বিভাগ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির আপত্তি উপেক্ষা করে ভূমি মন্ত্রণালয় এই জমি বরাদ্দ দিয়েছে। বন বিভাগের দাবি, এই জমি তাদের। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এই জমি বরাদ্দ নিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এ বনভূমিতে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ নিষেধ। এ কারণে বন বিভাগ থেকে ‘এই ভূমি বন্দোবস্তযোগ্য নয়’ উল্লেখ করে বিভিন্ন দফতরে চিঠি দেওয়া হয়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দপত্রে দেশের অন্যতম জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ বনভূমিকে অকৃষি খাসজমি হিসেবে দেখানো হয়েছে।

ভূমি মন্ত্রণালয় বলেছে, বরাদ্দ দেওয়া জমির ৪০০ একর পাহাড় ও ৩০০ একর ছড়া বা ঝরনা। তারা জমির মূল্য ধরেছে ৪ হাজার ৮০৩ কোটি ৬৪ লাখ ২৩ হাজার ৬০০ টাকা। কিন্তু একাডেমির জন্য প্রতীকী মূল্য ধরা হয়েছে মাত্র ১ লাখ টাকা।

১৯৩৫ সালে ব্রিটিশ সরকার একে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করে। বন বিভাগ এত বছর ধরে এটি রক্ষণাবেক্ষণ করছে। বিপন্ন এশীয় বন্য হাতিসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণীর নিরাপদ বসতি এই ঝিলংজা বনভূমি। বন আইন অনুযায়ী, পাহাড় ও ছড়া সমৃদ্ধ এই বনভূমির ইজারা দেওয়া বা না দেওয়ার এখতিয়ার কেবল বন বিভাগের। বন বিভাগ ভূমি মন্ত্রণালয়কে লেখা তাদের চিঠিতে বলেছে, ১৯৯০ সালে জারি করা ভূমি মন্ত্রণালয়েরই একটি পরিপত্রে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড় ও পাহাড়ের ঢাল বন্দোবস্তযোগ্য নয় এবং ওই জমি মূলত বন বিভাগ বনায়নের জন্য ব্যবহার করবে। বন আইন অনুযায়ী, এ ধরনের সংরক্ষিত বনে কোনো ধরনের স্থাপনা করা নিষিদ্ধ।

এ প্রতিবেদন যুক্ত করে হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট আবেদন দাখিল করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শেখ মো. মনিরুজ্জামান কবির।

শুনানিতে তিনি বলেন, ৭০০ একর বনভূমির মালিক বন বিভাগ। তাদের আপত্তি উপেক্ষা করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে এ ভূমি বরাদ্দ দিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। যদিও এই বনভূমির মালিক ভূমি মন্ত্রণালয় নয়।

শুনানিতে আইনজীবী বলেন, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা রক্ষার জন্য দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় রয়েছে। সেখানে সরকারের একটি বিভাগ ৭০০ একর বনভূমি ধ্বংস করে সেখানে প্রশিক্ষণ একাডেমি নির্মাণের জন্য এই জমি বরাদ্দ নিয়েছে। যদি এখানে একাডেমি করা হয় তাহলে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় নেমে আসবে।

শুনানি শেষে হাইকোর্ট বনভূমি বরাদ্দ তিন মাসের জন্য স্থগিত করে রুল জারি করেন।

আপনার মতামত লিখুন :