ঢাকা ১৮ জুলাই, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
হাজার থেকে ২৮০০ টাকা কেজি, মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে ইলিশ চীনে বড় ভূমিধস : ৮ জন নিহত, ৩৪ জন নিখোঁজ সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাস পূর্তিতে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণায় রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে বার্নহ্যাম, শপথ নিচ্ছেন কবে মার্কিন হামলায় ইরানের ১০ হাজার মানুষের পানি সরবরাহ বন্ধ গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানালেন জি কে শামীম পাশার দান উল্টে দিয়ে নবম ব্যালন ডি’অর জয়ের পথে মেসি সিরিজ বাঁচানোর ম্যাচে বাংলাদেশের সম্ভাব্য একাদশ মার্কিন চাপের মধ্যেই লেবাননে স্থায়ী সেনাপোস্ট করছে ইসরায়েল

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণায় রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা

#

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৮ জুলাই, ২০২৬,  2:14 PM

news image

সম্প্রতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফিরতে চাওয়ার ঘোষণা বাংলাদেশে বেশ হইচই ফেলে দিয়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন।

হাসিনার এই মন্তব্য দেশের গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আকারে প্রচার পাওয়ার পর বিভিন্ন মহল থেকে বিভিন্ন রকমের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি যারা একসময় হাসিনাকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তারাও প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে পারছেন না।

শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে দেশ ত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হবার পর বেশ কয়েকটি বিদেশি গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেগুলো ছিল ইমেইলের মাধ্যমে প্রশ্নোত্তর এবং উত্তরের ভাষা দেখে মনে হয়েছে—সেগুলো কোনও আইনজীবীর হাত দিয়ে গেছে।

সেসব সাক্ষাৎকার ছিল মূলত তাঁর ক্ষমতাচ্যুত সরকারের পক্ষে এবং মুহাম্মাদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের বিপক্ষে একটি বয়ান। সাক্ষাৎকারগুলো বিদেশি বা আন্তর্জাতিক ‘অডিয়েন্স’ লক্ষ্য করেই দেওয়া হয়েছিল বলে মনে হয়েছে।

সাক্ষাৎকারগুলো এমন সময়ে দেওয়া হয়েছিল, যখন হাসিনার নিয়োজিত আইনজীবীরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনে হাসিনার পক্ষে এবং ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে যোগাযোগ করছিলেন। সেগুলো ছিল আন্তর্জাতিক পরিসরে হাসিনার জনসংযোগ তৎপরতার অংশ। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারটি দুটি কারণে ভিন্ন।

এই প্রথম তিনি টেলিফোনে সাক্ষাৎকার দিলেন। রয়টার্সের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর সঙ্গে তাদের একঘণ্টার বেশি সময় ধরে কথা হয়েছে। তারা সেই কথোপকথনের অডিও প্রকাশ করে না করলেও বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এই সংবাদ সংস্থার তথ্য নিয়ে কোনও সন্দেহ থাকার কারণ নেই।

দ্বিতীয়ত, এই প্রথমবার তিনি বাংলাদেশে ফেরা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কথা বলেছেন। দিন-তারিখ না জানালেও ডিসেম্বরের কথা উল্লেখ থাকায় স্বাভাবিকভাবেই দেশের গণমাধ্যমে রয়টার্সের রিপোর্ট কৌতূহলের সঙ্গে প্রচার করা হয়।

আসলেই কী ফাঁসি

জল্পনা-কল্পনা বিভিন্ন দিকে ডানা মেলেছে—হাসিনা যদি আসার সিদ্ধান্ত নিয়েই থাকেন, তাহলে পাঁচ মাস পরে কেন? এটা কি দেশের ভেতরে আওয়ামী লীগের বিমর্ষ হয়ে পড়া নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙা করার কৌশল? এটা কি আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করার একটা প্রচেষ্টা?

সরকারের মতলব নিয়েও স্পেকুলেশনের শেষ নেই— সরকার কি আদৌ তাঁকে দেশে ঢুকতে দেবে? ঢোকার পর কী হবে? তাঁর কি আসলেই ফাঁসি হতে পারে? নাকি বাকি জীবন জেলে থাকবেন?

গত বছর নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তার আগেই তৎকালীন সরকার হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতকে কূটনৈতিক বার্তার মাধ্যমে অনুরোধ জানায়। তবে ভারত হাসিনাকে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ফেরত পাঠাবে, তেমন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।    

আওয়ামী লীগ নেত্রী স্বেচ্ছায় দেশে প্রত্যাবর্তন করার ঘোষণা দেওয়ার পর সরকারি প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে, তারা হাসিনার ফেরার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছে না। হাসিনা যে আসলেই দেশে ফেরার একটা চেষ্টা করতে পারে, সে বিষয়টা মাথায় রেখেই তারা এখন মন্তব্য করছেন।

সরকারের মন্ত্রীরা মোটামুটি একই সুরে কথা বলছেন, যার মূল বার্তা হলো—ফিরে আসলে হাসিনাকে জেলে যেতে হবে। তবে তিনি দেশে প্রবেশ করামাত্র গ্রেফতার হবেন, নাকি আদালতে আত্মসমর্পণ করার পর জেলে যাবেন, সে বিষয়টা এখনও ঘোলাটে।

“আমরা তো চাই তিনি দেশে ফিরুক, ”স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন। “সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে তাঁকে গ্রেফতার করা হবে এবং রায় কার্যকরের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

হাসিনা তাঁর সাক্ষাৎকারে ‘আদালতে আত্মসমর্পণ’ করার কথা বলেছেন, কিন্তু সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে তিনি সেটা করতে পারবেন কিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি। বিষয়টা আইনজ্ঞরা জানেন’ বলে পাশ কাটাতে চেয়েছেন।

বাচ্চু রাজাকারের নজির

দেশের পত্র-পত্রিকা একটু ঘাঁটালেই দেখা যাবে, একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি, জামায়াতের নেতা আবুল কালাম আজাদ, ১২ বছর বিদেশে গাঢাকা দিয়ে থাকার পর ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে আত্মসমর্পণ করেন।

বাচ্চু রাজাকার নামে পরিচিত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই পলাতক আসামি আত্মসমর্পণ করার আগে ফৌজদারি বিধি অনুযায়ী তাঁর সাজা স্থগিতের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। এই মন্ত্রণালয় সালাহউদ্দিন আহমদের মন্ত্রণালয়—আজাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর সাজা এক বছরের জন্য স্থগিত করে। 

আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারকে ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল ১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়। বিচার শুরু হবার আগেই আজাদ পলাতক ছিলেন।

আবুল কালাম আজাদের আত্মসমর্পণ নজীর স্থাপন করেছে যে মৃত্যুদণ্ড-প্রাপ্ত পলাতক আসামি নির্বিঘ্নে দেশে ফিরে, তাঁর সাজা স্থগিতের নিশ্চয়তা নিয়ে আদালতের কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারেন। শেখ হাসিনা যদি আইনের কাছ থেকে একই সুবিধা প্রার্থনা করেন, তাহলে সেটা মঞ্জুর না করাটাই হবে পক্ষপাতদুষ্ট এবং তাঁর নাগরিক অধিকারের লঙ্ঘন। হয়তো সে কারণেই সালাহউদ্দিন আহমদ বিষয়টা ‘আইনজ্ঞরা জানেন’ বলে পাশ কাটাতে চেয়েছেন।  

এখানেই শেখ হাসিনার বিপদ কোথায় এবং কেন তিনি পাঁচ মাস পরে ফেরার কথা বলছেন, তাঁর উত্তর পাওয়া যেতে পারে।

আবুল কালাম আজাদ অত্যন্ত অনুকূল একটি রাজনৈতিক পরিবেশে দেশে ফিরেছেন। তাঁর দল জামায়াত ২০২৪-এর আগস্টের পর থেকেই দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রস্থলে। তাদের লক্ষ্যই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিতর্কিত করে, ২০২৪-এর অভ্যুত্থানকে ১৯৭১-এর ওপরে স্থান দিয়ে নিজেদের দলকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত করা। এই প্রক্রিয়ায় দলের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক নেতা শুধু ছাড়াই পাননি, তিনি এখন সংসদ সদস্য। আরেকজন আজাদ, এখন মুক্ত।

প্রতিকূল পরিবেশে হাসিনা

হাসিনার জন্য পরিবেশ হচ্ছে সম্পূর্ণ উল্টো। বর্তমানে বিএনপি সরকারে। কিন্তু জামায়াত আর এনসিপি খাতা-কলমে বিরোধী দল হলেও ইউনূস আমলের মতো এখনও তারা ক্ষমতার বলয়ের ভেতরেই আছে। এখানে রাজনৈতিক দল তিনটি হলেও ‘ঘরানা’ একটি। তাদের ঐক্যের আঠা হলো আওয়ামী বিরোধিতা, যেকোনও মূল্যে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন প্রতিহত করা তাদের জন্য জরুরি।

তাদের সবার নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থও এখানে জড়িত আছে। বিএনপি ফেব্রুয়ারি মাসে দেখেছে আওয়ামী লীগ-বিহীন নির্বাচন মানে ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়া। জামায়াত দেখেছে, আওয়ামী লীগের আদর্শিক উপস্থিতি না থাকলে তারা তাদের ১৯৭১-এর অপকর্ম মুছে ফেলতে পারবে। এনসিপি জানে আওয়ামী লীগের চোখে তারাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় শত্রু, তারাই সারা দেশে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙা থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করার পেছনে শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। 

এই রাজনৈতিক পরিবেশে শেখ হাসিনা আদৌ ফিরবেন কিনা, সেটা একটা যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন। তিনি ফিরলে আইন-আদালতের কাছ থেকে যে ধরনের ন্যায়বিচার আশা করছেন, সেটা তিনি কতটুক পাবেন, সেটা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায়। তিনি কোন ভরসায় বাংলাদেশে ফেরত আসার ঘোষণা দিলেন, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চললে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

এরইমধ্যে সংসদে বিরোধী দলের চিফ হুইপ এবং এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আরেক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে ‘কেবলমাত্র ফিরবে ফাঁসির রায় কার্যকর করার জন্য’। হাসিনা সম্ভবত এই সম্ভাবনার কথা ভেবেই সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “আমাকে গ্রেফতার করা হতে পারে, আমাকে মেরে ফেলাও হতে পারে।”

সম্ভবত এই প্রতিকূল পরিবেশের কারণেই হাসিনা পাঁচ মাস পর ফেরার কথা বলেছেন। এই পাঁচ মাসে তিনি বা যারা দেশের ভেতরে এবং বাইরে তাঁকে সহায়তা করছে, তারা আলোচনার মাধ্যমে পরিবেশ অনুকূল করতে না পারলেও অপেক্ষাকৃত কম বৈরী করার চেষ্টা করবে। ফেরার আগে একাধিক বিষয়ে সমঝোতা হতে হবে, যা না হলে তাঁর ফেরা চরম ঝুঁকিপূর্ণ হবে।

logo
সম্পাদক ও প্রকাশক মো: মনিরুজ্জামান মনির