যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্কের চাপে বিশ্ববাণিজ্যে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করছে ভারত। এসব চুক্তির পাশাপাশি উৎপাদন খাতে সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) অতিরিক্ত ১৪০ বিলিয়ন ডলার যুক্ত হতে পারে। বর্তমান পূর্বাভাসের তুলনায় ভারতের অর্থনীতি বড় হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানিও বাড়তে পারে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশটির শুল্কনীতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গড় শুল্কহার যেখানে ছিল ২ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০২৫ সালের আগস্টে তা বেড়ে ১০ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ায়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানিকারক দেশগুলোর প্রতিযোগিতার পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ নতুন বাণিজ্য চুক্তি করছে কিংবা বিদ্যমান চুক্তির পরিধি বাড়াচ্ছে। ভারতও একই পথে হাঁটছে। দেশটির লক্ষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি কমে যাওয়ার সম্ভাব্য ক্ষতি অন্য বাজারে রপ্তানি বাড়িয়ে পুষিয়ে নেওয়া।
মার্কিন শুল্কের প্রভাব সামলে উঠতে পারে ভারত
একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মডেলের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা ভারতীয় পণ্যের ওপর গড় শুল্কহার ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৫ সালের আগস্টে তা বেড়ে ১১ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছায়। এর ফলে ২০৩৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি প্রায় ২০ শতাংশ কমে যেতে পারে।
তবে ভারতের মোট উৎপাদনের ২ শতাংশেরও কম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরশীল। ফলে অন্যান্য দেশে রপ্তানি বাড়াতে পারলে মার্কিন শুল্কের নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। এ কারণে দেশটির সামগ্রিক জিডিপিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও তুলনামূলক কম।
যেভাবে অর্থনীতিতে সুফল আনবে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি
ভারতের মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—শুল্ক হ্রাস, বাণিজ্য বাধা কমানো এবং বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
প্রস্তাবিত হিসাব অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় ভারতের বাণিজ্যিক অংশীদাররা প্রথম বছরেই ভারতীয় পণ্যের ওপর সব শুল্ক তুলে নেবে। ভারতও শিল্পপণ্যের ওপর শুল্ক বাতিল করবে। কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক অর্ধেক কমানো হবে, যার অর্ধেক প্রথম বছরে এবং বাকি অংশ পরবর্তী ১০ বছরে কার্যকর হওয়ার কথা ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া আগামী ১৫ বছরে পণ্য ও পরিষেবা খাতে অশুল্ক বাধার কারণে সৃষ্ট ব্যয় ধাপে ধাপে ২৫ শতাংশ কমতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। এতে ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমার পাশাপাশি বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তাও হ্রাস পেতে পারে।
মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধি। ইউরোপীয় মুক্ত বাণিজ্য সংস্থার (ইএফটিএ) সঙ্গে চুক্তির আওতায় ১৫ বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত বিনিয়োগ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তিতে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার প্রায় পুরোটাই অতিরিক্ত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ভারতের চলমান ও পরিকল্পিত বাণিজ্য চুক্তিগুলো কার্যকর হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশটির জিডিপি বর্তমান পূর্বাভাসের তুলনায় ১৭০ বিলিয়ন ডলার বা ২ দশমিক ১ শতাংশ বেশি হতে পারে।
ইতোমধ্যে কার্যকর মুক্তবাণিজ্য চুক্তিগুলোর প্রভাবে ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতের জিডিপি ১ দশমিক ২ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০২৭ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি কার্যকর হলে এই হার বেড়ে ১ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। এতে দেশটির অর্থনীতিতে প্রায় ১৪০ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে আরও শূন্য দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট যোগ হতে পারে। এ ছাড়া ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ ও ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা সফল হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ আরও বাড়তে পারে।
সব চুক্তি কার্যকর হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতের রপ্তানি বর্তমান পূর্বাভাসের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আমদানি ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে। এতে ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো আরও বেশি পণ্য ও পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ পাবে। পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় ভারতীয় উৎপাদকদের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতেও নজর ভারতের
বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সম্প্রসারণের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে ভারত। সম্ভাব্য অন্তর্বর্তী চুক্তির আওতায় কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় গাড়ি ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের মোট শুল্কহার ১৫ শতাংশে নামতে পারে। তবে বেশির ভাগ আওতাভুক্ত পণ্যের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ ধাতব শুল্ক এবং ১০ শতাংশ ধারা ৩০১-এর শুল্ক বহাল থাকার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্যিক উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা কমানোই এ ধরনের চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য।
মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সুফল পুরোপুরি কাজে লাগাতে ভারতকে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কারও এগিয়ে নিতে হবে। করপোরেট কর কমানো, ভর্তুকি দেওয়া, অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ এবং কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর মতো উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক মডেল অনুযায়ী, উৎপাদন খরচ প্রায় ২ শতাংশ কমানো সম্ভব হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে ১ শতাংশীয় পয়েন্ট এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট যোগ হতে পারে।
এ ছাড়া জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং উন্নত প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। এসব পদক্ষেপ উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভারতীয় পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে।
ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আরেকটি বড় বাধা হলো কৃষিতে বিপুল কর্মসংস্থান। দেশটির ৪০ শতাংশের বেশি কর্মী কৃষি খাতে নিয়োজিত, যা গত এক দশকে খুব বেশি পরিবর্তিত হয়নি।
অন্যদিকে, দ্রুত শিল্পায়নের মধ্য দিয়ে ভিয়েতনামে কৃষিশ্রমিকের হার ৪০ শতাংশের বেশি থেকে কমে প্রায় ২৫ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে দেশটিতে মাথাপিছু কৃষি উৎপাদন ভারতের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি হয়েছে।
ভারতেও কৃষিশ্রমিকদের ধাপে ধাপে উৎপাদন ও সেবা খাতে কাজের সুযোগ তৈরি করা গেলে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাড়তে পারে। মডেল অনুযায়ী, এ ধরনের পরিবর্তন ২০৩৫ সালের মধ্যে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে ১ শতাংশীয় পয়েন্টের বেশি এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে প্রায় ২ শতাংশীয় পয়েন্ট যোগ করতে পারে।
চুক্তির পাশাপাশি সংস্কারই হবে মূল চাবিকাঠি
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মুক্তবাণিজ্য চুক্তি ভারতের জন্য নতুন বাজার, বিনিয়োগ ও রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে শুধু চুক্তি স্বাক্ষর করলেই প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে না। কার্যকর বাস্তবায়ন, উৎপাদন খরচ কমানো, প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং শ্রমশক্তিকে উৎপাদনশীল খাতে যুক্ত করার ওপরও সাফল্য নির্ভর করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করলেও বিকল্প বাজার সম্প্রসারণ ও অভ্যন্তরীণ সংস্কারের সমন্বয় করতে পারলে ভারত এই পরিস্থিতিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগে পরিণত করতে পারে।

মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্কের চাপে বিশ্ববাণিজ্যে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করছে ভারত। এসব চুক্তির পাশাপাশি উৎপাদন খাতে সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) অতিরিক্ত ১৪০ বিলিয়ন ডলার যুক্ত হতে পারে। বর্তমান পূর্বাভাসের তুলনায় ভারতের অর্থনীতি বড় হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানিও বাড়তে পারে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশটির শুল্কনীতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গড় শুল্কহার যেখানে ছিল ২ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০২৫ সালের আগস্টে তা বেড়ে ১০ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ায়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানিকারক দেশগুলোর প্রতিযোগিতার পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ নতুন বাণিজ্য চুক্তি করছে কিংবা বিদ্যমান চুক্তির পরিধি বাড়াচ্ছে। ভারতও একই পথে হাঁটছে। দেশটির লক্ষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি কমে যাওয়ার সম্ভাব্য ক্ষতি অন্য বাজারে রপ্তানি বাড়িয়ে পুষিয়ে নেওয়া।
মার্কিন শুল্কের প্রভাব সামলে উঠতে পারে ভারত
একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মডেলের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা ভারতীয় পণ্যের ওপর গড় শুল্কহার ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৫ সালের আগস্টে তা বেড়ে ১১ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছায়। এর ফলে ২০৩৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি প্রায় ২০ শতাংশ কমে যেতে পারে।
তবে ভারতের মোট উৎপাদনের ২ শতাংশেরও কম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরশীল। ফলে অন্যান্য দেশে রপ্তানি বাড়াতে পারলে মার্কিন শুল্কের নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। এ কারণে দেশটির সামগ্রিক জিডিপিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও তুলনামূলক কম।
যেভাবে অর্থনীতিতে সুফল আনবে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি
ভারতের মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—শুল্ক হ্রাস, বাণিজ্য বাধা কমানো এবং বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
প্রস্তাবিত হিসাব অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় ভারতের বাণিজ্যিক অংশীদাররা প্রথম বছরেই ভারতীয় পণ্যের ওপর সব শুল্ক তুলে নেবে। ভারতও শিল্পপণ্যের ওপর শুল্ক বাতিল করবে। কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক অর্ধেক কমানো হবে, যার অর্ধেক প্রথম বছরে এবং বাকি অংশ পরবর্তী ১০ বছরে কার্যকর হওয়ার কথা ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া আগামী ১৫ বছরে পণ্য ও পরিষেবা খাতে অশুল্ক বাধার কারণে সৃষ্ট ব্যয় ধাপে ধাপে ২৫ শতাংশ কমতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। এতে ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমার পাশাপাশি বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তাও হ্রাস পেতে পারে।
মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধি। ইউরোপীয় মুক্ত বাণিজ্য সংস্থার (ইএফটিএ) সঙ্গে চুক্তির আওতায় ১৫ বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত বিনিয়োগ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তিতে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার প্রায় পুরোটাই অতিরিক্ত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ভারতের চলমান ও পরিকল্পিত বাণিজ্য চুক্তিগুলো কার্যকর হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশটির জিডিপি বর্তমান পূর্বাভাসের তুলনায় ১৭০ বিলিয়ন ডলার বা ২ দশমিক ১ শতাংশ বেশি হতে পারে।
ইতোমধ্যে কার্যকর মুক্তবাণিজ্য চুক্তিগুলোর প্রভাবে ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতের জিডিপি ১ দশমিক ২ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০২৭ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি কার্যকর হলে এই হার বেড়ে ১ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। এতে দেশটির অর্থনীতিতে প্রায় ১৪০ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে আরও শূন্য দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট যোগ হতে পারে। এ ছাড়া ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ ও ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা সফল হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ আরও বাড়তে পারে।
সব চুক্তি কার্যকর হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতের রপ্তানি বর্তমান পূর্বাভাসের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আমদানি ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে। এতে ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো আরও বেশি পণ্য ও পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ পাবে। পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় ভারতীয় উৎপাদকদের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতেও নজর ভারতের
বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সম্প্রসারণের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে ভারত। সম্ভাব্য অন্তর্বর্তী চুক্তির আওতায় কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় গাড়ি ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের মোট শুল্কহার ১৫ শতাংশে নামতে পারে। তবে বেশির ভাগ আওতাভুক্ত পণ্যের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ ধাতব শুল্ক এবং ১০ শতাংশ ধারা ৩০১-এর শুল্ক বহাল থাকার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্যিক উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা কমানোই এ ধরনের চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য।
মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সুফল পুরোপুরি কাজে লাগাতে ভারতকে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কারও এগিয়ে নিতে হবে। করপোরেট কর কমানো, ভর্তুকি দেওয়া, অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ এবং কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর মতো উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক মডেল অনুযায়ী, উৎপাদন খরচ প্রায় ২ শতাংশ কমানো সম্ভব হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে ১ শতাংশীয় পয়েন্ট এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট যোগ হতে পারে।
এ ছাড়া জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং উন্নত প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। এসব পদক্ষেপ উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভারতীয় পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে।
ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আরেকটি বড় বাধা হলো কৃষিতে বিপুল কর্মসংস্থান। দেশটির ৪০ শতাংশের বেশি কর্মী কৃষি খাতে নিয়োজিত, যা গত এক দশকে খুব বেশি পরিবর্তিত হয়নি।
অন্যদিকে, দ্রুত শিল্পায়নের মধ্য দিয়ে ভিয়েতনামে কৃষিশ্রমিকের হার ৪০ শতাংশের বেশি থেকে কমে প্রায় ২৫ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে দেশটিতে মাথাপিছু কৃষি উৎপাদন ভারতের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি হয়েছে।
ভারতেও কৃষিশ্রমিকদের ধাপে ধাপে উৎপাদন ও সেবা খাতে কাজের সুযোগ তৈরি করা গেলে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাড়তে পারে। মডেল অনুযায়ী, এ ধরনের পরিবর্তন ২০৩৫ সালের মধ্যে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে ১ শতাংশীয় পয়েন্টের বেশি এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে প্রায় ২ শতাংশীয় পয়েন্ট যোগ করতে পারে।
চুক্তির পাশাপাশি সংস্কারই হবে মূল চাবিকাঠি
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মুক্তবাণিজ্য চুক্তি ভারতের জন্য নতুন বাজার, বিনিয়োগ ও রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে শুধু চুক্তি স্বাক্ষর করলেই প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে না। কার্যকর বাস্তবায়ন, উৎপাদন খরচ কমানো, প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং শ্রমশক্তিকে উৎপাদনশীল খাতে যুক্ত করার ওপরও সাফল্য নির্ভর করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করলেও বিকল্প বাজার সম্প্রসারণ ও অভ্যন্তরীণ সংস্কারের সমন্বয় করতে পারলে ভারত এই পরিস্থিতিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগে পরিণত করতে পারে।

মতামত