ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লেফট উইং নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার প্রত্যাবর্তন লাতিন আমেরিকায় নিজেদের প্রভাব বিস্তারের মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, অনেকটা ট্রাম্পের ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষায় পানি ঢেলে মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব রক্ষার যে অবস্থান লুলা নিয়েছেন, তা নির্বাচনী প্রচারে তার পক্ষে জনসমর্থন তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে নিজেদের প্রভাববলয়ে আনার ট্রাম্পের কৌশলের সামনে ব্রাজিলের অবস্থানও স্পষ্ট করেছে।
নির্বাচনে জয়ের পর দেওয়া ভাষণে লুলা ঘোষণা করেন, ‘ব্রাজিল কারও পেছনের উঠান হয়ে থাকতে রাজি নয়।’ ওয়াশিংটনের উদ্দেশে দেওয়া এই বার্তায় তিনি স্পষ্ট করে দেন, নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব মেনে নিতে 'প্রস্তুত নয় ব্রাজিল'।
সাধারণত, কোনো দেশের নির্বাচনে, পররাষ্ট্রনীতি এককভাবে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে না। ব্রাজিলের নির্বাচনও এর ব্যতিক্রম ছিল না।
তবে ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের যে অভিযোগ লুলা তুলে আসছিলেন, তা দেশটির মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে উসকে দেয়। নির্বাচনী প্রচারে বিষয়টি তার জন্য কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
সাবেক শ্রমিকনেতা, লুলার, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গেও এই অবস্থান সামঞ্জস্যপূর্ণ। ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর যে ভাবমূর্তি তিনি গড়ে তুলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তার দৃঢ় অবস্থান সেটিকেই আরও জোরালো করেছে।
বিষয়টির একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, লুলার এই অবস্থান হয়তো ট্রাম্পের কাছেও তার প্রতি একধরনের সম্মান তৈরি করেছে।
নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি লুলাকে পছন্দ করি। আমাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে তিনি কোনো পক্ষ নেননি। তবে একই সঙ্গে নির্বাচনকে ‘ভয়াবহ’ ও ‘কারচুপিপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্পের বক্তব্যে বিরোধিতা থাকলেও দুই নেতার সম্পর্ক যে সরল সমীকরণে চলছে না, তা স্পষ্ট। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি লুলার প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর পক্ষে অবস্থান নেননি।
অন্যদিকে, ব্রাজিলের সুপ্রিম ইলেকটোরাল কোর্ট নির্বাচনে অনিয়মের কোনো প্রমাণ না পেলেও ফ্লাভিও ফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে ফ্লাভিওর বাবা ও ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল।
প্রায় এক বছর আগে, লুলার বাসভবনে, তার সঙ্গে কথা বলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্রাজিলের সম্পর্ক ছিল তলানিতে। সে সময় লুলা জানিয়েছিলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের কখনো কথা হয়নি এবং তিনি নিজে থেকে ট্রাম্পকে ফোন করারও কোনো পরিকল্পনা করেননি।
এর কিছুদিন আগেই, ব্রাজিলের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প। এর পেছনে বড় কারণ ছিল জাইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানচেষ্টার অভিযোগে চলা বিচারপ্রক্রিয়া।
ওই বিচারকে ‘উইচ হান্ট’ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি বলে আখ্যা দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কিছু মিত্রদেশ ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সতর্ক ও নমনীয় অবস্থান নিলেও লুলা সরাসরি পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখান। ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব নিয়ে জোরালো বক্তব্য দেন তিনি। এছাড়াও বিচারিক প্রক্রিয়ায় মার্কিন হস্তক্ষেপের সমালোচনা করেন এবং ‘ব্রাজিল ব্রাজিলীয়দের’, এমন বার্তা লেখা নীল টুপিও পরতে শুরু করেন তিনি।
এই অবস্থানের পর লুলার জনসমর্থন বেড়ে যায়।
শুল্ক আরোপের পক্ষে তদবির চালানো বলসোনারো পরিবারকে দেশপ্রেমহীন বলেও অভিযুক্ত করেন লুলা। এতে এমন এক রাজনৈতিক ডানপন্থি শিবির চাপে পড়ে, যারা সাধারণত দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদকে নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরে।
এমনকি, ব্রাজিলের কৃষি খাতের কিছু প্রভাবশালী মহলও লুলার বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়। সাধারণত, বলসোনারোর শক্তিশালী সমর্থক হিসেবে পরিচিত এই মহলের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। ফলে শুল্ক আরোপের বিরোধিতায় লুলার অবস্থান তাদের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা পায়।
শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র শুল্কের বিষয়ে পিছু হটে এবং তা কমিয়ে দেয়। যদিও পরবর্তী সময়ে শুল্ক আবারও বেড়েছে।
এরপর দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। জাতিসংঘে দুই নেতার কথা হয়। পরে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে তাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠককে ‘খুব ভালো’ বলে বর্ণনা করেন ট্রাম্প। আর লুলা জানান, তিনি বৈঠক শেষে ‘খুব সন্তুষ্ট’।
এই ঘটনাকে এমন একটি ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে যে, দৃঢ় অবস্থান নেওয়া নেতাদের প্রতি ট্রাম্পের একধরনের আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু সম্পর্কের উন্নতি সত্ত্বেও ব্রাজিলের নির্বাচনের ফল কেন ট্রাম্পের জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে ডানপন্থিদের উত্থান ঘটেছে। ইকুয়েডর, চিলি, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা ও পেরুতে এমন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন, যাদের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।
এই নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চান ট্রাম্প। তার এই কৌশল ‘ডনরো ডকট্রিন’ নামে পরিচিত।
উনিশ শতকের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মনরো ডকট্রিনের সঙ্গে ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থানের সমন্বয় ঘটিয়ে এ নাম দেওয়া হয়েছে।
লাতিন আমেরিকা বিষয়ে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ ফেলো ক্রিস্টোফার সাবাতিনি মনে করেন, প্রথম দফার ভোটে ফ্লাভিও বলসোনারো জয়ী হওয়ার পর ব্রাজিলকে নিজেদের প্রভাববলয়ে আনার বিষয়ে আশাবাদী হয়ে উঠেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। তার ভাষায়, ব্রাজিল ছিল ট্রাম্পের জন্য ‘দশম এবং সবচেয়ে বড় পুরস্কার’।
এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। ব্রাজিল লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতি। ফ্লাভিও বলসোনারো জয়ী হলে তিনি মাদক পাচারের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের ‘শিল্ড অব দ্য আমেরিকাস’ জোটে যোগ দিতে পারেন, এমন প্রত্যাশাও ছিল।
এছাড়া চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরল মৃত্তিকা খনিজের মজুত রয়েছে ব্রাজিলে। আধুনিক প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস ও বিভিন্ন শিল্পে এসব খনিজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার রয়েছে। ব্রাজিলের এসব সম্পদে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রবেশাধিকার পাওয়ার বিষয়েও আগ্রহী ছিল যুক্তরাষ্ট্র।
ফলে ব্রাজিলে লুলার প্রত্যাবর্তন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়; বরং লাতিন আমেরিকায় মার্কিন প্রভাব বিস্তারের বৃহত্তর পরিকল্পনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের সম্পর্কের উন্নতি হলেও সামনে নতুন করে বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। লুলার সামনে আরও চার বছরের মেয়াদ থাকায় দুই দেশের মধ্যে একাধিক ইস্যুতে মতবিরোধ দেখা দিতে পারে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে, ব্রাজিল অভিযোগ করেছিল, দেশটির নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এ সময় ব্রাজিল সফরে যাওয়ার পরিকল্পনা করা মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের দুই কর্মকর্তাকে ভিসা দেয়নি দেশটি।
ওয়াশিংটন এ অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ব্রাজিলে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূতের ভিসা বাতিল করে যুক্তরাষ্ট্র।
এখন ট্রাম্প যদি ব্রাজিলের নির্বাচনের ফলকে বারবার ‘কারচুপিপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করতে থাকেন, তাহলে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নেও লুলার সঙ্গে ট্রাম্পের মতবিরোধ রয়েছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ঘটনা থেকে শুরু করে মাদক পাচারের অভিযোগে সন্দেহভাজন নৌযানে বোমা হামলা, লাতিন আমেরিকা অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের কঠোর বিরোধিতা করেছেন লুলা।
ফ্লাভিও বলসোনারোর তদবিরের পর যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলের দুটি বড় অপরাধী চক্রকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার সিদ্ধান্ত নিলে তারও তীব্র সমালোচনা করেন লুলা। এসব পদক্ষেপ ব্রাজিলের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হানতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
বিষয়টি ব্রাজিলের বামপন্থি রাজনীতির জন্য বিশেষভাবে সংবেদনশীল। কারণ, বিংশ শতাব্দীতে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত স্বৈরশাসন এবং সেসব শাসনকে কমিউনিজম ঠেকানোর যুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সমর্থন দেওয়ার ইতিহাস এখনো এ অঞ্চলের রাজনৈতিক স্মৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের সম্পর্কের আরেকটি সম্ভাব্য বিরোধের ক্ষেত্র হলো প্রযুক্তি খাত।
নির্বাচনী প্রচারণার সময়, লুলার শিবির অভিযোগ করেছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠান মেটা ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রতি পক্ষপাত দেখিয়েছে। মেটা এ অভিযোগ অস্বীকার করলেও স্বীকার করে, কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা ও প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে ভুলবশত কয়েকটি পোস্ট সরিয়ে ফেলা হয়েছিল অথবা সেগুলোর প্রচার সীমিত হয়ে পড়েছিল।
এর জবাবে, লুলার সমর্থকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভরতা কমাতে হোয়াটসঅ্যাপের প্রায় এক কোটি সদস্যের একটি গ্রুপের মাধ্যমে তার বার্তা ছড়িয়ে দেন।
এদিকে, ব্রাজিলের তাৎক্ষণিক অর্থ পরিশোধব্যবস্থা ‘পিক্স’ নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের অসন্তোষ রয়েছে। দেশটির এই ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি এনেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে, পিক্সের সম্প্রসারণ ভিসা ও মাস্টারকার্ডের মতো মার্কিন পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় ভাগ বসাচ্ছে।
ফলে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়; অর্থনৈতিক স্বার্থ, প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।
নির্বাচনী প্রচারে, ব্রাজিলের রাজনৈতিক বিভাজনও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বলসোনারোর সমর্থকেরা বিভিন্ন সমাবেশে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা ওড়ান। এমনকি একটি সমাবেশে ‘ট্রাম্প, ব্রাজিলে পারমাণবিক হামলা চালাও’ লেখা একটি ব্যানারও দেখা যায়।
অন্যদিকে, লুলা ও তার সমর্থকেরা অভিযোগ করেন, ফ্লাভিও বলসোনারো ব্রাজিলের স্বার্থের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তবে দুই দেশের সম্পর্কের সম্ভাব্য সংকটকে অতিরঞ্জিত করে দেখারও সুযোগ নেই। চীনের পর যুক্তরাষ্ট্র এখনো ব্রাজিলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্য পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আপাতত দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কও আগের তুলনায় ভালো।
তবে এই পরিস্থিতি কত দিন স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কতটা হস্তক্ষেপের চেষ্টা করে এবং তার জবাবে লুলা কতটা দৃঢ় অবস্থান নেন, তার ওপর।
ব্রাজিলের নির্বাচনে, লুলার প্রত্যাবর্তন তাই শুধু দেশটির ক্ষমতার রাজনীতিতে পরিবর্তনের ঘটনা নয়। লাতিন আমেরিকায় নিজেদের প্রভাব আরও বিস্তারের যে পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসন করছে, তার বাস্তবায়ন কতটা সহজ হবে, সেই প্রশ্নও নতুন করে সামনে এনেছে এই ফল।

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লেফট উইং নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার প্রত্যাবর্তন লাতিন আমেরিকায় নিজেদের প্রভাব বিস্তারের মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, অনেকটা ট্রাম্পের ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষায় পানি ঢেলে মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব রক্ষার যে অবস্থান লুলা নিয়েছেন, তা নির্বাচনী প্রচারে তার পক্ষে জনসমর্থন তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে নিজেদের প্রভাববলয়ে আনার ট্রাম্পের কৌশলের সামনে ব্রাজিলের অবস্থানও স্পষ্ট করেছে।
নির্বাচনে জয়ের পর দেওয়া ভাষণে লুলা ঘোষণা করেন, ‘ব্রাজিল কারও পেছনের উঠান হয়ে থাকতে রাজি নয়।’ ওয়াশিংটনের উদ্দেশে দেওয়া এই বার্তায় তিনি স্পষ্ট করে দেন, নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব মেনে নিতে 'প্রস্তুত নয় ব্রাজিল'।
সাধারণত, কোনো দেশের নির্বাচনে, পররাষ্ট্রনীতি এককভাবে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে না। ব্রাজিলের নির্বাচনও এর ব্যতিক্রম ছিল না।
তবে ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের যে অভিযোগ লুলা তুলে আসছিলেন, তা দেশটির মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে উসকে দেয়। নির্বাচনী প্রচারে বিষয়টি তার জন্য কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
সাবেক শ্রমিকনেতা, লুলার, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গেও এই অবস্থান সামঞ্জস্যপূর্ণ। ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর যে ভাবমূর্তি তিনি গড়ে তুলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তার দৃঢ় অবস্থান সেটিকেই আরও জোরালো করেছে।
বিষয়টির একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, লুলার এই অবস্থান হয়তো ট্রাম্পের কাছেও তার প্রতি একধরনের সম্মান তৈরি করেছে।
নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি লুলাকে পছন্দ করি। আমাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে তিনি কোনো পক্ষ নেননি। তবে একই সঙ্গে নির্বাচনকে ‘ভয়াবহ’ ও ‘কারচুপিপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্পের বক্তব্যে বিরোধিতা থাকলেও দুই নেতার সম্পর্ক যে সরল সমীকরণে চলছে না, তা স্পষ্ট। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি লুলার প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর পক্ষে অবস্থান নেননি।
অন্যদিকে, ব্রাজিলের সুপ্রিম ইলেকটোরাল কোর্ট নির্বাচনে অনিয়মের কোনো প্রমাণ না পেলেও ফ্লাভিও ফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে ফ্লাভিওর বাবা ও ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল।
প্রায় এক বছর আগে, লুলার বাসভবনে, তার সঙ্গে কথা বলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্রাজিলের সম্পর্ক ছিল তলানিতে। সে সময় লুলা জানিয়েছিলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের কখনো কথা হয়নি এবং তিনি নিজে থেকে ট্রাম্পকে ফোন করারও কোনো পরিকল্পনা করেননি।
এর কিছুদিন আগেই, ব্রাজিলের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প। এর পেছনে বড় কারণ ছিল জাইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানচেষ্টার অভিযোগে চলা বিচারপ্রক্রিয়া।
ওই বিচারকে ‘উইচ হান্ট’ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি বলে আখ্যা দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কিছু মিত্রদেশ ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সতর্ক ও নমনীয় অবস্থান নিলেও লুলা সরাসরি পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখান। ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব নিয়ে জোরালো বক্তব্য দেন তিনি। এছাড়াও বিচারিক প্রক্রিয়ায় মার্কিন হস্তক্ষেপের সমালোচনা করেন এবং ‘ব্রাজিল ব্রাজিলীয়দের’, এমন বার্তা লেখা নীল টুপিও পরতে শুরু করেন তিনি।
এই অবস্থানের পর লুলার জনসমর্থন বেড়ে যায়।
শুল্ক আরোপের পক্ষে তদবির চালানো বলসোনারো পরিবারকে দেশপ্রেমহীন বলেও অভিযুক্ত করেন লুলা। এতে এমন এক রাজনৈতিক ডানপন্থি শিবির চাপে পড়ে, যারা সাধারণত দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদকে নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরে।
এমনকি, ব্রাজিলের কৃষি খাতের কিছু প্রভাবশালী মহলও লুলার বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়। সাধারণত, বলসোনারোর শক্তিশালী সমর্থক হিসেবে পরিচিত এই মহলের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। ফলে শুল্ক আরোপের বিরোধিতায় লুলার অবস্থান তাদের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা পায়।
শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র শুল্কের বিষয়ে পিছু হটে এবং তা কমিয়ে দেয়। যদিও পরবর্তী সময়ে শুল্ক আবারও বেড়েছে।
এরপর দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। জাতিসংঘে দুই নেতার কথা হয়। পরে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে তাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠককে ‘খুব ভালো’ বলে বর্ণনা করেন ট্রাম্প। আর লুলা জানান, তিনি বৈঠক শেষে ‘খুব সন্তুষ্ট’।
এই ঘটনাকে এমন একটি ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে যে, দৃঢ় অবস্থান নেওয়া নেতাদের প্রতি ট্রাম্পের একধরনের আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু সম্পর্কের উন্নতি সত্ত্বেও ব্রাজিলের নির্বাচনের ফল কেন ট্রাম্পের জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে ডানপন্থিদের উত্থান ঘটেছে। ইকুয়েডর, চিলি, কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা ও পেরুতে এমন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন, যাদের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।
এই নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চান ট্রাম্প। তার এই কৌশল ‘ডনরো ডকট্রিন’ নামে পরিচিত।
উনিশ শতকের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মনরো ডকট্রিনের সঙ্গে ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থানের সমন্বয় ঘটিয়ে এ নাম দেওয়া হয়েছে।
লাতিন আমেরিকা বিষয়ে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ ফেলো ক্রিস্টোফার সাবাতিনি মনে করেন, প্রথম দফার ভোটে ফ্লাভিও বলসোনারো জয়ী হওয়ার পর ব্রাজিলকে নিজেদের প্রভাববলয়ে আনার বিষয়ে আশাবাদী হয়ে উঠেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। তার ভাষায়, ব্রাজিল ছিল ট্রাম্পের জন্য ‘দশম এবং সবচেয়ে বড় পুরস্কার’।
এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। ব্রাজিল লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতি। ফ্লাভিও বলসোনারো জয়ী হলে তিনি মাদক পাচারের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের ‘শিল্ড অব দ্য আমেরিকাস’ জোটে যোগ দিতে পারেন, এমন প্রত্যাশাও ছিল।
এছাড়া চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরল মৃত্তিকা খনিজের মজুত রয়েছে ব্রাজিলে। আধুনিক প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস ও বিভিন্ন শিল্পে এসব খনিজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার রয়েছে। ব্রাজিলের এসব সম্পদে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রবেশাধিকার পাওয়ার বিষয়েও আগ্রহী ছিল যুক্তরাষ্ট্র।
ফলে ব্রাজিলে লুলার প্রত্যাবর্তন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়; বরং লাতিন আমেরিকায় মার্কিন প্রভাব বিস্তারের বৃহত্তর পরিকল্পনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের সম্পর্কের উন্নতি হলেও সামনে নতুন করে বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। লুলার সামনে আরও চার বছরের মেয়াদ থাকায় দুই দেশের মধ্যে একাধিক ইস্যুতে মতবিরোধ দেখা দিতে পারে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে, ব্রাজিল অভিযোগ করেছিল, দেশটির নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এ সময় ব্রাজিল সফরে যাওয়ার পরিকল্পনা করা মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের দুই কর্মকর্তাকে ভিসা দেয়নি দেশটি।
ওয়াশিংটন এ অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ব্রাজিলে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূতের ভিসা বাতিল করে যুক্তরাষ্ট্র।
এখন ট্রাম্প যদি ব্রাজিলের নির্বাচনের ফলকে বারবার ‘কারচুপিপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করতে থাকেন, তাহলে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নেও লুলার সঙ্গে ট্রাম্পের মতবিরোধ রয়েছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ঘটনা থেকে শুরু করে মাদক পাচারের অভিযোগে সন্দেহভাজন নৌযানে বোমা হামলা, লাতিন আমেরিকা অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের কঠোর বিরোধিতা করেছেন লুলা।
ফ্লাভিও বলসোনারোর তদবিরের পর যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলের দুটি বড় অপরাধী চক্রকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার সিদ্ধান্ত নিলে তারও তীব্র সমালোচনা করেন লুলা। এসব পদক্ষেপ ব্রাজিলের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হানতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
বিষয়টি ব্রাজিলের বামপন্থি রাজনীতির জন্য বিশেষভাবে সংবেদনশীল। কারণ, বিংশ শতাব্দীতে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত স্বৈরশাসন এবং সেসব শাসনকে কমিউনিজম ঠেকানোর যুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সমর্থন দেওয়ার ইতিহাস এখনো এ অঞ্চলের রাজনৈতিক স্মৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের সম্পর্কের আরেকটি সম্ভাব্য বিরোধের ক্ষেত্র হলো প্রযুক্তি খাত।
নির্বাচনী প্রচারণার সময়, লুলার শিবির অভিযোগ করেছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠান মেটা ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রতি পক্ষপাত দেখিয়েছে। মেটা এ অভিযোগ অস্বীকার করলেও স্বীকার করে, কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা ও প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে ভুলবশত কয়েকটি পোস্ট সরিয়ে ফেলা হয়েছিল অথবা সেগুলোর প্রচার সীমিত হয়ে পড়েছিল।
এর জবাবে, লুলার সমর্থকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভরতা কমাতে হোয়াটসঅ্যাপের প্রায় এক কোটি সদস্যের একটি গ্রুপের মাধ্যমে তার বার্তা ছড়িয়ে দেন।
এদিকে, ব্রাজিলের তাৎক্ষণিক অর্থ পরিশোধব্যবস্থা ‘পিক্স’ নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের অসন্তোষ রয়েছে। দেশটির এই ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি এনেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে, পিক্সের সম্প্রসারণ ভিসা ও মাস্টারকার্ডের মতো মার্কিন পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় ভাগ বসাচ্ছে।
ফলে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়; অর্থনৈতিক স্বার্থ, প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।
নির্বাচনী প্রচারে, ব্রাজিলের রাজনৈতিক বিভাজনও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বলসোনারোর সমর্থকেরা বিভিন্ন সমাবেশে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা ওড়ান। এমনকি একটি সমাবেশে ‘ট্রাম্প, ব্রাজিলে পারমাণবিক হামলা চালাও’ লেখা একটি ব্যানারও দেখা যায়।
অন্যদিকে, লুলা ও তার সমর্থকেরা অভিযোগ করেন, ফ্লাভিও বলসোনারো ব্রাজিলের স্বার্থের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তবে দুই দেশের সম্পর্কের সম্ভাব্য সংকটকে অতিরঞ্জিত করে দেখারও সুযোগ নেই। চীনের পর যুক্তরাষ্ট্র এখনো ব্রাজিলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্য পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আপাতত দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কও আগের তুলনায় ভালো।
তবে এই পরিস্থিতি কত দিন স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কতটা হস্তক্ষেপের চেষ্টা করে এবং তার জবাবে লুলা কতটা দৃঢ় অবস্থান নেন, তার ওপর।
ব্রাজিলের নির্বাচনে, লুলার প্রত্যাবর্তন তাই শুধু দেশটির ক্ষমতার রাজনীতিতে পরিবর্তনের ঘটনা নয়। লাতিন আমেরিকায় নিজেদের প্রভাব আরও বিস্তারের যে পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসন করছে, তার বাস্তবায়ন কতটা সহজ হবে, সেই প্রশ্নও নতুন করে সামনে এনেছে এই ফল।

মতামত