বাঙালির বাংলাদেশ
প্রকাশ : রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

২৮ দিনের প্রচারযুদ্ধ, কণ্ঠে ক্লান্তি আর বিদায়ের সুর, মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত ট্রাম্প

২৮ দিনের প্রচারযুদ্ধ, কণ্ঠে ক্লান্তি আর বিদায়ের সুর, মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকান পার্টির পক্ষে শেষ মুহূর্তের প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একের পর এক সমাবেশে যোগ দিতে ছুটে বেড়াচ্ছেন রিপাবলিকান-অধ্যুষিত বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে।

তবে এবারের প্রচারে ভোটারদের কাছে দেশের অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ট্রাম্প নিজেই। বলরুম নির্মাণ থেকে শুরু করে নিজের শারীরিক গঠন, এমনকি মানসিক সক্ষমতা যাচাইয়ের পরীক্ষা, বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ও উঠে আসছে তার বক্তব্যে।

বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণের বদলে মাঠপর্যায়ে সমাবেশগুলো কাভার করা সিএনএনের সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এবারের প্রচারে ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য ভোটারদের এমনভাবে উদ্বুদ্ধ করা, যেন নির্বাচনে প্রার্থী তিনি নিজেই। যদিও তার জনপ্রিয়তা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগও বাড়ছে।

গত কয়েক সপ্তাহে, এয়ারফোর্স ওয়ানে চড়ে এমন সব অঙ্গরাজ্যে প্রচারে গেছেন ট্রাম্প, যেগুলো কয়েক মাস আগেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বলে বিবেচিত হতো না। ব্যক্তিগত আলোচনায় তিনি স্বীকার করেছেন, দলটির প্রধান নির্বাচনী মুখ হিসেবে হয়তো এটিই তার শেষ বড় প্রচারাভিযান। চলতি মাসে, দুই ডজনের বেশি সমাবেশে অংশ নিয়েছেন তিনি। ফলে এসব আয়োজনকে অনেকটা বিদায়ী সফরের মতো মনে হচ্ছে।

যে ব্যক্তি একের পর এক জনসভায় রিপাবলিকান পার্টি এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছেন, সেই ট্রাম্পই এখন ‘ওয়াইএমসিএ’ গানের তালে নেচে মঞ্চ ছাড়ছেন। কানসাসের উইচিটায়, ট্রাম্পের সমাবেশ কাভার করা সিএনএন সাংবাদিক বেটসি ক্লেইনের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, এবারের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্পের সমর্থকদের ধরন আগের তুলনায় অনেকটাই বদলে গেছে।

২০১৬ ও ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার কাভার করার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি চলতি বছরও নয়টি অঙ্গরাজ্যে ট্রাম্পের সমাবেশে অংশ নিয়েছেন তিনি। তার মতে, ২০১৫ সালে, ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর যেসব সমাবেশ হয়েছিল, সেগুলোতে রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমতের মানুষও উপস্থিত থাকতেন। অনেকেই ছিলেন কৌতূহলী কিংবা সিদ্ধান্তহীন ভোটার।

কিন্তু এবারের প্রচারে যাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের অধিকাংশই রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অর্থাৎ সমাবেশগুলোতে এখন ট্রাম্পের সবচেয়ে অনুগত সমর্থক এবং তার ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘মাগা’ আন্দোলনের অনুসারীদের উপস্থিতিই বেশি। তবে কানসাসে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখেছেন তিনি। ২০২৪ সালের নির্বাচনে, ১৬% পয়েন্টের ব্যবধানে ট্রাম্পকে জয়ী করা এই অঙ্গরাজ্যে ১৯৩২ সালের পর কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হননি।

গত ১৯ অক্টোবর, পার্ক সিটিতে, ট্রাম্পের সমাবেশে এক মায়ের সঙ্গে কথা বলেন ক্লেইন। সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী রজার মার্শাল এবং ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিল্টনের মধ্যে কাকে ভোট দেবেন, তা নিয়ে তখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি ওই নারী। তার প্রধান উদ্বেগ ছিল অর্থনীতি।

একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীও জানান, ট্রাম্পের সমাবেশে অংশ নেওয়ার পর তিনি হ্যামিল্টনকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার ভাষায়, কানসাসের মানুষ অনেক কিছুই সহ্য করেছে। পরিবর্তন আনার মতো ভোটার সেখানে যথেষ্ট রয়েছে। এদিকে, দক্ষিণ ক্যারোলাইনার ক্লেমসনে, ট্রাম্পের সমাবেশে একাধিকবার বিক্ষোভকারীদের বাধার মুখে পড়তে হয় নিরাপত্তাকর্মীদের।

সিএনএন সাংবাদিক আলাইনা ট্রিনের বর্ণনা অনুযায়ী, ২১ অক্টোবর ক্লেমসন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একটি পশুপালন প্রদর্শনী কেন্দ্রে আয়োজিত সমাবেশে অন্তত ১২ বার বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে নেয় নিরাপত্তা বাহিনী। ট্রাম্প মঞ্চে ওঠার কয়েক মিনিটের মধ্যেই শুরু হয় প্রতিবাদ। কেউ তাকে অপরাধী বলে চিৎকার করেন, কেউ অশালীন ভাষায় গালাগাল করেন। আবার কেউ তাকে 'বিশ্বাসঘাতক' বলেও আক্রমণ করেন।

সাম্প্রতিক নির্বাচনী সমাবেশগুলোতে, এমন প্রতিবাদ আগের তুলনায় বেশি চোখে পড়ছে বলে মনে করেছেন সাংবাদিকেরা। তবে এসব ঘটনায় বিরক্তি প্রকাশের বদলে রসিকতা করেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন ট্রাম্প। পরপর তিনবার বক্তব্যে বাধা আসার পর তিনি বলেন, বিক্ষোভকারীরা সব সময় তার বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশে বাধা দেন। এমনকি, তাদের সময়জ্ঞানও বেশ ভালো বলে কৌতুক করেন তিনি। পরে বিক্ষোভকারীদের ‘ব্যর্থ’ বলেও মন্তব্য করেন।

ফ্লোরিডার ফোর্ট মায়ার্সে ২৩ অক্টোবরের সমাবেশে ট্রাম্পকে বেশ আত্মবিশ্বাসী দেখালেও সেখানে তার উপস্থিতিই রিপাবলিকানদের নির্বাচনী উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছিল বলে মনে করেন সিএনএন সাংবাদিক অ্যাডাম ক্যানক্রিন। ফ্লোরিডার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তারপরও গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী লড়াইয়ে দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারে সময় দিতে হয়েছে ট্রাম্পকে।

সমাবেশে তিনি ভোটারদের বারবার রিপাবলিকান প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। ডেমোক্র্যাটদের সিনেট প্রার্থী অ্যাঞ্জি নিক্সনের শক্ত অবস্থান নিয়েও বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি। রিপাবলিকান সিনেটর অ্যাশলি মুডির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিক্সনের প্রচারকে উল্লেখ করে ট্রাম্প প্রশ্ন তোলেন, তার নিজের প্রতিপক্ষ হিসেবে এমন প্রার্থী কেন নেই। তবে ইরান যুদ্ধ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির বাড়তি দাম নিয়ে খুব বেশি সময় ব্যয় করেননি তিনি। বরং মধ্যবর্তী নির্বাচনকে নিজের প্রতি সমর্থনের পরীক্ষায় পরিণত করার চেষ্টা করেন।

ট্রাম্প সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, ‘এই নির্বাচনে আমি আপনাদের অনুরোধ করছি, কিছু মনে না করলে এমনটা ভাবুন যে ব্যালটে আমার নামও রয়েছে।’ জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে প্রশ্ন, ট্রাম্পের বক্তব্যে অস্বস্তি জর্জিয়ার পেরিতে, ২৪ অক্টোবরের সমাবেশে, ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র তেল থেকে শত শত বিলিয়ন, এমনকি ট্রিলিয়ন ডলার আয় করছে। অথচ একই সময়ে দেশটির সাধারণ মানুষকে পেট্রল ও জ্বালানির উচ্চমূল্য দিতে হচ্ছে।

বক্তব্যের এই অসংগতির বিষয়টি যেন নিজেই বুঝতে পেরেছিলেন ট্রাম্প। তিনি জানান, জ্বালানির দাম ও তেল নিয়ে কথা না বলতে তার উপদেষ্টারা তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে সেই পরামর্শ উপেক্ষা করে তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যম পরে হয়তো লিখবে, মানুষ জ্বালানির উচ্চমূল্যে ভুগলেও ট্রাম্প তেল থেকে বিপুল অর্থ আয়ের কথা বলছেন। এরপরও বিষয়টি নিয়ে কথা বলা বন্ধ করবেন না বলে জানান তিনি।

তার এই মন্তব্যে সমাবেশে উপস্থিত অনেকেই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তবে সাংবাদিক রাফায়েল রোমোর পর্যবেক্ষণে, পেছনের সারিতে থাকা কয়েকজনকে পরস্পরের দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকাতে দেখা যায়। ওবামার সমাবেশের সঙ্গে তুলনা, নিকি মিনাজকে নিয়ে মন্তব্য

মিশিগানের পোর্ট হুরনে, ২৫ অক্টোবরের সমাবেশে, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে নিয়েও কথা বলেন ট্রাম্প। তার দাবি, আগের দিন ওবামা সেখানে যে সমাবেশ করেছেন, তাতে তার নিজের সমাবেশের মতো জনসমাগম হয়নি। তবে একই সময়ে, ডেট্রয়েটে, ওবামার সমাবেশেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ছিল বলে জানান সিএনএন সাংবাদিক আরলেট সায়েঞ্জ। তিনি দুই নেতার সমাবেশেই উপস্থিত ছিলেন। নির্বাচনের মাত্র নয় দিন আগে দুই সাবেক ও বর্তমান প্রেসিডেন্টের বিপরীতমুখী রাজনৈতিক বক্তব্যের চিত্রও সামনে আসে।

মিশিগানের ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদকে নিয়ে ট্রাম্পের মুসলিমবিরোধী মন্তব্যের পাশাপাশি সমাবেশে মানুষের শারীরিক গঠন নিয়েও কথা বলেন তিনি। রিপাবলিকান সিনেটর জন হুস্টেডের শারীরিক গঠন নিয়ে মন্তব্য করার পর মার্কিন র‍্যাপার নিকি মিনাজের প্রশংসা করেন ট্রাম্প।

মঞ্চে উপস্থিত মিনাজকে দাঁড়াতে বলার পর তার শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে মন্তব্য করেন তিনি। এমনকি রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্সের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশংসা করতে রাজি বলে কৌতুক করেন ট্রাম্প। তবে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্যযুদ্ধ এবং জ্বালানির উচ্চমূল্যে ক্ষতিগ্রস্ত মিশিগানের ভোটারদের কাছে এসব মন্তব্য কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

হোয়াইট হাউসের বলরুম নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা মিসিসিপির করিন্থে, ২৬ অক্টোবরের সমাবেশে, আবারও নিজের সংস্কার প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘ সময় কথা বলেন ট্রাম্প। বিশেষ করে হোয়াইট হাউসের সংস্কার ও নতুন বলরুম নির্মাণ নিয়ে তার আগ্রহ চোখে পড়ে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ট্রাম্পের, রুচির সমালোচনা করেছিলেন। বলরুমের নকশাকে তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের রুচির সঙ্গে তুলনা করে চিজকেক ফ্যাক্টরির মতো বলেও মন্তব্য করেছিলেন। এর জবাবে ট্রাম্প বলেন, চিজকেক ফ্যাক্টরি একটি সফল প্রতিষ্ঠান এবং ওবামা হোয়াইট হাউসের রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্ব বোঝেন না। তার ভাষায়, হোয়াইট হাউস যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে। তাই এটি সব সময় পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর রাখা প্রয়োজন।

এরপর হোয়াইট হাউসের উত্তর দিকের বারান্দার প্লাস্টার মেরামত এবং দক্ষিণ লনে নতুন হেলিপ্যাড স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন তিনি। তবে এসব বিষয়ে সমাবেশে খুব একটা উচ্ছ্বাস দেখা যায়নি। একপর্যায়ে এক বিক্ষোভকারী বলরুম নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিবাদে অশালীন ভাষায় চিৎকার করেন। মার-আ-লাগোতে ৫ হাজার ডলারে বার্গার!

নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে, ২৭ অক্টোবর, টেক্সাসের করপাস ক্রিস্টি ও লুবকে দুটি সমাবেশে অংশ নেন ট্রাম্প। রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী কেন প্যাক্সটনের পক্ষে প্রচারে গিয়ে তিনি ঘোষণা দেন, কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানরা ধরে রাখতে পারলে মার্কিন নাগরিকদের পাঁচ হাজার ডলারের চেক দেওয়া হবে। করপাস ক্রিস্টির সমাবেশে ট্রাম্প সমর্থকদের সেই অর্থ দিয়ে তার বিলাসবহুল অবকাশযাপন কেন্দ্র মার-আ-লাগোতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান।

তবে একই সঙ্গে রসিকতা করে বলেন, পাঁচ হাজার ডলারে সেখানে বড়জোর একটি হ্যামবার্গার ও ছোট একটি ডেজার্ট কেনা সম্ভব হতে পারে। এমনকি সেটিও কেনা যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি। জীবনযাত্রার ব্যয় যখন ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ, তখন এমন মন্তব্য রিপাবলিকান শিবিরের জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

বিতর্কিত নির্বাচনী বিজ্ঞাপনের পক্ষেও ট্রাম্প ওহাইও ও আইওয়ার সমাবেশগুলোতে, ট্রাম্প, ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম বিতর্কিত একটি বিজ্ঞাপনের পক্ষেও অবস্থান নেন। বিজ্ঞাপনটি তৈরি করেছে ওহাইও'র রিপাবলিকান গভর্নর প্রার্থী বিবেক রামাস্বামীর প্রচারশিবির। বিজ্ঞাপনটিতে ডেমোক্র্যাট গভর্নর প্রার্থী অ্যামি অ্যাক্টনের বিচ্ছিন্ন থাকা মাকে মেয়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে দেখা যায়। সেখানে তিনি মেয়েকে মিথ্যাবাদী বলে আখ্যা দেন।

অ্যাক্টনের দাবি, তার বয়স ১২ বছর হওয়ার পর থেকে মায়ের সঙ্গে আর দেখা হয়নি। ওই সময় তার সৎবাবার বিরুদ্ধে শিশুদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগে গ্র্যান্ড জুরি তদন্ত শুরু করেছিল এবং তার মা সন্তানদের হেফাজত হারান। বিজ্ঞাপনটি নিয়ে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট: উভয় শিবির থেকেই সমালোচনা হয়েছে। এমনকি, ওহাইও'র বর্তমান রিপাবলিকান গভর্নর মাইক ডিওয়াইনও এর নিন্দা জানিয়েছেন। তবে ২৮ অক্টোবর ওহাইওর সমাবেশে ট্রাম্প বিজ্ঞাপনটির সমালোচনাকে অন্যায্য বলে মন্তব্য করেন। আইওয়ার সিউক্স সিটিতেও এর পক্ষে কথা বলেন তিনি।

এ ঘটনায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী অ্যাশলি হিনসন। কারণ, এর আগে, একইদিন, তিনি বিজ্ঞাপনটিকে ‘হাস্যকর’ উল্লেখ করে সেটি সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞাপনটির পক্ষে কথা বললেও হিনসন প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।

গত ২৯ অক্টোবর, দক্ষিণ ক্যারোলাইনার রক হিলের সমাবেশে, সাম্প্রতিক জনমত জরিপ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ট্রাম্প। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত জরিপগুলোকে ‘ভুয়া’ ও ‘অবাস্তব’ বলে দাবি করেন তিনি।

বিশেষকরে, নিজের জনপ্রিয়তার হার ৪২ শতাংশ দেখানো জরিপ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তার দাবি, এসব জরিপে প্রকৃত জনসমর্থনের প্রতিফলন ঘটছে না।

তবে কোন জরিপের কথা বলছেন, তা স্পষ্ট করেননি তিনি। অন্যদিকে, সিএনএনের পোল অব পোলসের গড় হিসাবে সে সময় ট্রাম্পের অনুমোদনের হার ছিল ৩৪ শতাংশ।

জরিপের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে দীর্ঘ সময় সমালোচনা করার পর সমাবেশে উপস্থিত সমর্থকদের কাছেই প্রশ্ন করেন ট্রাম্প। জানতে চান, তাদের মধ্যে কতজনকে কখনো জনমত জরিপে অংশ নিতে বলা হয়েছে। সাংবাদিকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সেখানে উপস্থিত অল্প কয়েকজন হাত তুলেছিলেন।

২৮ দিনের টানা প্রচারে ক্লান্ত ট্রাম্প, তবু থামছেন না

নির্বাচনের আগের শুক্রবার ফ্লোরিডার এক সমাবেশে ট্রাম্প প্রশ্ন করেন, তার সমাবেশের চেয়ে ভালো কিছু আছে কি না। এর আগে একপর্যায়ে মনে হয়েছিল, এটিই হয়তো তার শেষ নির্বাচনী সমাবেশ। কারণ, কানসাস ও আইওয়ায় সপ্তাহান্তের নির্ধারিত দুটি সমাবেশ বাতিল করা হয়েছিল। পরে আবার সেগুলো তার কর্মসূচিতে যুক্ত হয়।

ট্রাম্প সমর্থকদের জানান, তিনি ভেবেছিলেন এবার কিছুটা বিশ্রাম নিতে পারবেন। গত ২৮ দিন টানা প্রচার চালানোর ক্লান্তির কথাও তুলে ধরেন তিনি।

তার কণ্ঠ তখন বেশ কর্কশ শোনাচ্ছিল। নিজের কণ্ঠের সক্ষমতা নিয়ে রসিকতা করে বলেন, সেটি এখন মাত্র ৪৯ দশমিক ২ শতাংশ কার্যকর রয়েছে।

পরবর্তী সময়ে সরাসরি সমাবেশের পরিবর্তে টেলির‍্যালির মাধ্যমে নির্বাচনের শেষ মুহূর্তের বক্তব্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তার প্রচারশিবির। তবে সমাবেশ বাতিল নিয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও অসন্তোষ প্রকাশ করেন ট্রাম্প।

তার দাবি, সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যগুলোর রিপাবলিকান নেতারাই তাকে সরাসরি উপস্থিত হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য ছিল, জয় নিশ্চিত করতে ট্রাম্পের উপস্থিতি প্রয়োজন।

ফ্লোরিডায় আরও একটি দেড় ঘণ্টার সমাবেশের পর অবশ্য আবারও প্রচারে ফেরার আগ্রহ দেখান তিনি।

সমর্থকদের জানান, রোববার তারা যখন টেলিভিশনে ফুটবল দেখবেন, তখন তিনি নিজের বিমানে করে আইওয়া ও কানসাসের উদ্দেশে রওনা হবেন।

সব মিলিয়ে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে ট্রাম্পের প্রচার কেবল দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, বিতর্কিত মন্তব্য, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ এবং নিজের নানা প্রকল্পের প্রচার, সবকিছু মিলিয়ে তার সমাবেশগুলো পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা।

একদিকে, উচ্ছ্বসিত মাগা সমর্থকদের উপস্থিতি, অন্যদিকে, জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনীতি নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ, এই দুই বাস্তবতার মাঝেই রিপাবলিকানদের নির্বাচনী ভাগ্য নির্ধারণের শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ট্রাম্প।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

২৮ দিনের প্রচারযুদ্ধ, কণ্ঠে ক্লান্তি আর বিদায়ের সুর, মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত ট্রাম্প
0:00 0:00
1.0x
বাঙালির বাংলাদেশ

রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬


২৮ দিনের প্রচারযুদ্ধ, কণ্ঠে ক্লান্তি আর বিদায়ের সুর, মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত ট্রাম্প

প্রকাশের তারিখ : ০১ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকান পার্টির পক্ষে শেষ মুহূর্তের প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একের পর এক সমাবেশে যোগ দিতে ছুটে বেড়াচ্ছেন রিপাবলিকান-অধ্যুষিত বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে।

তবে এবারের প্রচারে ভোটারদের কাছে দেশের অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ট্রাম্প নিজেই। বলরুম নির্মাণ থেকে শুরু করে নিজের শারীরিক গঠন, এমনকি মানসিক সক্ষমতা যাচাইয়ের পরীক্ষা, বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ও উঠে আসছে তার বক্তব্যে।

বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণের বদলে মাঠপর্যায়ে সমাবেশগুলো কাভার করা সিএনএনের সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এবারের প্রচারে ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য ভোটারদের এমনভাবে উদ্বুদ্ধ করা, যেন নির্বাচনে প্রার্থী তিনি নিজেই। যদিও তার জনপ্রিয়তা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগও বাড়ছে।

গত কয়েক সপ্তাহে, এয়ারফোর্স ওয়ানে চড়ে এমন সব অঙ্গরাজ্যে প্রচারে গেছেন ট্রাম্প, যেগুলো কয়েক মাস আগেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বলে বিবেচিত হতো না। ব্যক্তিগত আলোচনায় তিনি স্বীকার করেছেন, দলটির প্রধান নির্বাচনী মুখ হিসেবে হয়তো এটিই তার শেষ বড় প্রচারাভিযান। চলতি মাসে, দুই ডজনের বেশি সমাবেশে অংশ নিয়েছেন তিনি। ফলে এসব আয়োজনকে অনেকটা বিদায়ী সফরের মতো মনে হচ্ছে।

যে ব্যক্তি একের পর এক জনসভায় রিপাবলিকান পার্টি এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছেন, সেই ট্রাম্পই এখন ‘ওয়াইএমসিএ’ গানের তালে নেচে মঞ্চ ছাড়ছেন। কানসাসের উইচিটায়, ট্রাম্পের সমাবেশ কাভার করা সিএনএন সাংবাদিক বেটসি ক্লেইনের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, এবারের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্পের সমর্থকদের ধরন আগের তুলনায় অনেকটাই বদলে গেছে।

২০১৬ ও ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার কাভার করার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি চলতি বছরও নয়টি অঙ্গরাজ্যে ট্রাম্পের সমাবেশে অংশ নিয়েছেন তিনি। তার মতে, ২০১৫ সালে, ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর যেসব সমাবেশ হয়েছিল, সেগুলোতে রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমতের মানুষও উপস্থিত থাকতেন। অনেকেই ছিলেন কৌতূহলী কিংবা সিদ্ধান্তহীন ভোটার।

কিন্তু এবারের প্রচারে যাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের অধিকাংশই রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অর্থাৎ সমাবেশগুলোতে এখন ট্রাম্পের সবচেয়ে অনুগত সমর্থক এবং তার ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘মাগা’ আন্দোলনের অনুসারীদের উপস্থিতিই বেশি। তবে কানসাসে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখেছেন তিনি। ২০২৪ সালের নির্বাচনে, ১৬% পয়েন্টের ব্যবধানে ট্রাম্পকে জয়ী করা এই অঙ্গরাজ্যে ১৯৩২ সালের পর কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হননি।

গত ১৯ অক্টোবর, পার্ক সিটিতে, ট্রাম্পের সমাবেশে এক মায়ের সঙ্গে কথা বলেন ক্লেইন। সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী রজার মার্শাল এবং ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিল্টনের মধ্যে কাকে ভোট দেবেন, তা নিয়ে তখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি ওই নারী। তার প্রধান উদ্বেগ ছিল অর্থনীতি।

একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীও জানান, ট্রাম্পের সমাবেশে অংশ নেওয়ার পর তিনি হ্যামিল্টনকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার ভাষায়, কানসাসের মানুষ অনেক কিছুই সহ্য করেছে। পরিবর্তন আনার মতো ভোটার সেখানে যথেষ্ট রয়েছে। এদিকে, দক্ষিণ ক্যারোলাইনার ক্লেমসনে, ট্রাম্পের সমাবেশে একাধিকবার বিক্ষোভকারীদের বাধার মুখে পড়তে হয় নিরাপত্তাকর্মীদের।

সিএনএন সাংবাদিক আলাইনা ট্রিনের বর্ণনা অনুযায়ী, ২১ অক্টোবর ক্লেমসন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একটি পশুপালন প্রদর্শনী কেন্দ্রে আয়োজিত সমাবেশে অন্তত ১২ বার বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে নেয় নিরাপত্তা বাহিনী। ট্রাম্প মঞ্চে ওঠার কয়েক মিনিটের মধ্যেই শুরু হয় প্রতিবাদ। কেউ তাকে অপরাধী বলে চিৎকার করেন, কেউ অশালীন ভাষায় গালাগাল করেন। আবার কেউ তাকে 'বিশ্বাসঘাতক' বলেও আক্রমণ করেন।

সাম্প্রতিক নির্বাচনী সমাবেশগুলোতে, এমন প্রতিবাদ আগের তুলনায় বেশি চোখে পড়ছে বলে মনে করেছেন সাংবাদিকেরা। তবে এসব ঘটনায় বিরক্তি প্রকাশের বদলে রসিকতা করেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন ট্রাম্প। পরপর তিনবার বক্তব্যে বাধা আসার পর তিনি বলেন, বিক্ষোভকারীরা সব সময় তার বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশে বাধা দেন। এমনকি, তাদের সময়জ্ঞানও বেশ ভালো বলে কৌতুক করেন তিনি। পরে বিক্ষোভকারীদের ‘ব্যর্থ’ বলেও মন্তব্য করেন।

ফ্লোরিডার ফোর্ট মায়ার্সে ২৩ অক্টোবরের সমাবেশে ট্রাম্পকে বেশ আত্মবিশ্বাসী দেখালেও সেখানে তার উপস্থিতিই রিপাবলিকানদের নির্বাচনী উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছিল বলে মনে করেন সিএনএন সাংবাদিক অ্যাডাম ক্যানক্রিন। ফ্লোরিডার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তারপরও গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী লড়াইয়ে দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারে সময় দিতে হয়েছে ট্রাম্পকে।

সমাবেশে তিনি ভোটারদের বারবার রিপাবলিকান প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। ডেমোক্র্যাটদের সিনেট প্রার্থী অ্যাঞ্জি নিক্সনের শক্ত অবস্থান নিয়েও বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি। রিপাবলিকান সিনেটর অ্যাশলি মুডির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিক্সনের প্রচারকে উল্লেখ করে ট্রাম্প প্রশ্ন তোলেন, তার নিজের প্রতিপক্ষ হিসেবে এমন প্রার্থী কেন নেই। তবে ইরান যুদ্ধ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির বাড়তি দাম নিয়ে খুব বেশি সময় ব্যয় করেননি তিনি। বরং মধ্যবর্তী নির্বাচনকে নিজের প্রতি সমর্থনের পরীক্ষায় পরিণত করার চেষ্টা করেন।

ট্রাম্প সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, ‘এই নির্বাচনে আমি আপনাদের অনুরোধ করছি, কিছু মনে না করলে এমনটা ভাবুন যে ব্যালটে আমার নামও রয়েছে।’ জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে প্রশ্ন, ট্রাম্পের বক্তব্যে অস্বস্তি জর্জিয়ার পেরিতে, ২৪ অক্টোবরের সমাবেশে, ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র তেল থেকে শত শত বিলিয়ন, এমনকি ট্রিলিয়ন ডলার আয় করছে। অথচ একই সময়ে দেশটির সাধারণ মানুষকে পেট্রল ও জ্বালানির উচ্চমূল্য দিতে হচ্ছে।

বক্তব্যের এই অসংগতির বিষয়টি যেন নিজেই বুঝতে পেরেছিলেন ট্রাম্প। তিনি জানান, জ্বালানির দাম ও তেল নিয়ে কথা না বলতে তার উপদেষ্টারা তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে সেই পরামর্শ উপেক্ষা করে তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যম পরে হয়তো লিখবে, মানুষ জ্বালানির উচ্চমূল্যে ভুগলেও ট্রাম্প তেল থেকে বিপুল অর্থ আয়ের কথা বলছেন। এরপরও বিষয়টি নিয়ে কথা বলা বন্ধ করবেন না বলে জানান তিনি।

তার এই মন্তব্যে সমাবেশে উপস্থিত অনেকেই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তবে সাংবাদিক রাফায়েল রোমোর পর্যবেক্ষণে, পেছনের সারিতে থাকা কয়েকজনকে পরস্পরের দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকাতে দেখা যায়। ওবামার সমাবেশের সঙ্গে তুলনা, নিকি মিনাজকে নিয়ে মন্তব্য

মিশিগানের পোর্ট হুরনে, ২৫ অক্টোবরের সমাবেশে, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে নিয়েও কথা বলেন ট্রাম্প। তার দাবি, আগের দিন ওবামা সেখানে যে সমাবেশ করেছেন, তাতে তার নিজের সমাবেশের মতো জনসমাগম হয়নি। তবে একই সময়ে, ডেট্রয়েটে, ওবামার সমাবেশেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ছিল বলে জানান সিএনএন সাংবাদিক আরলেট সায়েঞ্জ। তিনি দুই নেতার সমাবেশেই উপস্থিত ছিলেন। নির্বাচনের মাত্র নয় দিন আগে দুই সাবেক ও বর্তমান প্রেসিডেন্টের বিপরীতমুখী রাজনৈতিক বক্তব্যের চিত্রও সামনে আসে।

মিশিগানের ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদকে নিয়ে ট্রাম্পের মুসলিমবিরোধী মন্তব্যের পাশাপাশি সমাবেশে মানুষের শারীরিক গঠন নিয়েও কথা বলেন তিনি। রিপাবলিকান সিনেটর জন হুস্টেডের শারীরিক গঠন নিয়ে মন্তব্য করার পর মার্কিন র‍্যাপার নিকি মিনাজের প্রশংসা করেন ট্রাম্প।

মঞ্চে উপস্থিত মিনাজকে দাঁড়াতে বলার পর তার শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে মন্তব্য করেন তিনি। এমনকি রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্সের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশংসা করতে রাজি বলে কৌতুক করেন ট্রাম্প। তবে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্যযুদ্ধ এবং জ্বালানির উচ্চমূল্যে ক্ষতিগ্রস্ত মিশিগানের ভোটারদের কাছে এসব মন্তব্য কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

হোয়াইট হাউসের বলরুম নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা মিসিসিপির করিন্থে, ২৬ অক্টোবরের সমাবেশে, আবারও নিজের সংস্কার প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘ সময় কথা বলেন ট্রাম্প। বিশেষ করে হোয়াইট হাউসের সংস্কার ও নতুন বলরুম নির্মাণ নিয়ে তার আগ্রহ চোখে পড়ে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ট্রাম্পের, রুচির সমালোচনা করেছিলেন। বলরুমের নকশাকে তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের রুচির সঙ্গে তুলনা করে চিজকেক ফ্যাক্টরির মতো বলেও মন্তব্য করেছিলেন। এর জবাবে ট্রাম্প বলেন, চিজকেক ফ্যাক্টরি একটি সফল প্রতিষ্ঠান এবং ওবামা হোয়াইট হাউসের রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্ব বোঝেন না। তার ভাষায়, হোয়াইট হাউস যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে। তাই এটি সব সময় পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর রাখা প্রয়োজন।

এরপর হোয়াইট হাউসের উত্তর দিকের বারান্দার প্লাস্টার মেরামত এবং দক্ষিণ লনে নতুন হেলিপ্যাড স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন তিনি। তবে এসব বিষয়ে সমাবেশে খুব একটা উচ্ছ্বাস দেখা যায়নি। একপর্যায়ে এক বিক্ষোভকারী বলরুম নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিবাদে অশালীন ভাষায় চিৎকার করেন। মার-আ-লাগোতে ৫ হাজার ডলারে বার্গার!

নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে, ২৭ অক্টোবর, টেক্সাসের করপাস ক্রিস্টি ও লুবকে দুটি সমাবেশে অংশ নেন ট্রাম্প। রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী কেন প্যাক্সটনের পক্ষে প্রচারে গিয়ে তিনি ঘোষণা দেন, কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানরা ধরে রাখতে পারলে মার্কিন নাগরিকদের পাঁচ হাজার ডলারের চেক দেওয়া হবে। করপাস ক্রিস্টির সমাবেশে ট্রাম্প সমর্থকদের সেই অর্থ দিয়ে তার বিলাসবহুল অবকাশযাপন কেন্দ্র মার-আ-লাগোতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান।

তবে একই সঙ্গে রসিকতা করে বলেন, পাঁচ হাজার ডলারে সেখানে বড়জোর একটি হ্যামবার্গার ও ছোট একটি ডেজার্ট কেনা সম্ভব হতে পারে। এমনকি সেটিও কেনা যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি। জীবনযাত্রার ব্যয় যখন ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ, তখন এমন মন্তব্য রিপাবলিকান শিবিরের জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

বিতর্কিত নির্বাচনী বিজ্ঞাপনের পক্ষেও ট্রাম্প ওহাইও ও আইওয়ার সমাবেশগুলোতে, ট্রাম্প, ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম বিতর্কিত একটি বিজ্ঞাপনের পক্ষেও অবস্থান নেন। বিজ্ঞাপনটি তৈরি করেছে ওহাইও'র রিপাবলিকান গভর্নর প্রার্থী বিবেক রামাস্বামীর প্রচারশিবির। বিজ্ঞাপনটিতে ডেমোক্র্যাট গভর্নর প্রার্থী অ্যামি অ্যাক্টনের বিচ্ছিন্ন থাকা মাকে মেয়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে দেখা যায়। সেখানে তিনি মেয়েকে মিথ্যাবাদী বলে আখ্যা দেন।

অ্যাক্টনের দাবি, তার বয়স ১২ বছর হওয়ার পর থেকে মায়ের সঙ্গে আর দেখা হয়নি। ওই সময় তার সৎবাবার বিরুদ্ধে শিশুদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগে গ্র্যান্ড জুরি তদন্ত শুরু করেছিল এবং তার মা সন্তানদের হেফাজত হারান। বিজ্ঞাপনটি নিয়ে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট: উভয় শিবির থেকেই সমালোচনা হয়েছে। এমনকি, ওহাইও'র বর্তমান রিপাবলিকান গভর্নর মাইক ডিওয়াইনও এর নিন্দা জানিয়েছেন। তবে ২৮ অক্টোবর ওহাইওর সমাবেশে ট্রাম্প বিজ্ঞাপনটির সমালোচনাকে অন্যায্য বলে মন্তব্য করেন। আইওয়ার সিউক্স সিটিতেও এর পক্ষে কথা বলেন তিনি।

এ ঘটনায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী অ্যাশলি হিনসন। কারণ, এর আগে, একইদিন, তিনি বিজ্ঞাপনটিকে ‘হাস্যকর’ উল্লেখ করে সেটি সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞাপনটির পক্ষে কথা বললেও হিনসন প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।

গত ২৯ অক্টোবর, দক্ষিণ ক্যারোলাইনার রক হিলের সমাবেশে, সাম্প্রতিক জনমত জরিপ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ট্রাম্প। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত জরিপগুলোকে ‘ভুয়া’ ও ‘অবাস্তব’ বলে দাবি করেন তিনি।

বিশেষকরে, নিজের জনপ্রিয়তার হার ৪২ শতাংশ দেখানো জরিপ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তার দাবি, এসব জরিপে প্রকৃত জনসমর্থনের প্রতিফলন ঘটছে না।

তবে কোন জরিপের কথা বলছেন, তা স্পষ্ট করেননি তিনি। অন্যদিকে, সিএনএনের পোল অব পোলসের গড় হিসাবে সে সময় ট্রাম্পের অনুমোদনের হার ছিল ৩৪ শতাংশ।

জরিপের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে দীর্ঘ সময় সমালোচনা করার পর সমাবেশে উপস্থিত সমর্থকদের কাছেই প্রশ্ন করেন ট্রাম্প। জানতে চান, তাদের মধ্যে কতজনকে কখনো জনমত জরিপে অংশ নিতে বলা হয়েছে। সাংবাদিকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সেখানে উপস্থিত অল্প কয়েকজন হাত তুলেছিলেন।

২৮ দিনের টানা প্রচারে ক্লান্ত ট্রাম্প, তবু থামছেন না

নির্বাচনের আগের শুক্রবার ফ্লোরিডার এক সমাবেশে ট্রাম্প প্রশ্ন করেন, তার সমাবেশের চেয়ে ভালো কিছু আছে কি না। এর আগে একপর্যায়ে মনে হয়েছিল, এটিই হয়তো তার শেষ নির্বাচনী সমাবেশ। কারণ, কানসাস ও আইওয়ায় সপ্তাহান্তের নির্ধারিত দুটি সমাবেশ বাতিল করা হয়েছিল। পরে আবার সেগুলো তার কর্মসূচিতে যুক্ত হয়।

ট্রাম্প সমর্থকদের জানান, তিনি ভেবেছিলেন এবার কিছুটা বিশ্রাম নিতে পারবেন। গত ২৮ দিন টানা প্রচার চালানোর ক্লান্তির কথাও তুলে ধরেন তিনি।

তার কণ্ঠ তখন বেশ কর্কশ শোনাচ্ছিল। নিজের কণ্ঠের সক্ষমতা নিয়ে রসিকতা করে বলেন, সেটি এখন মাত্র ৪৯ দশমিক ২ শতাংশ কার্যকর রয়েছে।

পরবর্তী সময়ে সরাসরি সমাবেশের পরিবর্তে টেলির‍্যালির মাধ্যমে নির্বাচনের শেষ মুহূর্তের বক্তব্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তার প্রচারশিবির। তবে সমাবেশ বাতিল নিয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও অসন্তোষ প্রকাশ করেন ট্রাম্প।

তার দাবি, সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যগুলোর রিপাবলিকান নেতারাই তাকে সরাসরি উপস্থিত হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য ছিল, জয় নিশ্চিত করতে ট্রাম্পের উপস্থিতি প্রয়োজন।

ফ্লোরিডায় আরও একটি দেড় ঘণ্টার সমাবেশের পর অবশ্য আবারও প্রচারে ফেরার আগ্রহ দেখান তিনি।

সমর্থকদের জানান, রোববার তারা যখন টেলিভিশনে ফুটবল দেখবেন, তখন তিনি নিজের বিমানে করে আইওয়া ও কানসাসের উদ্দেশে রওনা হবেন।

সব মিলিয়ে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে ট্রাম্পের প্রচার কেবল দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, বিতর্কিত মন্তব্য, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ এবং নিজের নানা প্রকল্পের প্রচার, সবকিছু মিলিয়ে তার সমাবেশগুলো পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা।

একদিকে, উচ্ছ্বসিত মাগা সমর্থকদের উপস্থিতি, অন্যদিকে, জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনীতি নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ, এই দুই বাস্তবতার মাঝেই রিপাবলিকানদের নির্বাচনী ভাগ্য নির্ধারণের শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ট্রাম্প।


বাঙালির বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মো: মনিরুজ্জামান (মনির)
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত