নিয়ম মেনে প্রতিদিন তিন বেলা খাবার খাচ্ছেন, তারপরও কি হজমের সমস্যায় ভুগছেন? কখনো পেট ভার হয়ে থাকছে, কখনো মলত্যাগ করতে গিয়ে অস্বস্তি হচ্ছে। আবার দুপুরের খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই অনুভব করছেন ক্ষুধা। এমন পরিস্থিতিতে শুধু ভিটামিন বা খনিজের অভাবকে দায়ী করা ঠিক হবে না। বরং আপনার প্রতিদিনের খাবারে পর্যাপ্ত ফাইবার রয়েছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পুষ্টির কথা উঠলে সাধারণত প্রোটিন, ভিটামিন, ক্যালসিয়াম কিংবা আয়রনের গুরুত্ব নিয়েই বেশি আলোচনা হয়। কিন্তু শরীরের স্বাভাবিক হজম প্রক্রিয়া সচল রাখতে ফাইবারের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় এই উপাদানটির ঘাটতি দেখা দিলে কোষ্ঠকাঠিন্যসহ নানা ধরনের হজমজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ফাইবারের চাহিদা পূরণ করতে দামি কোনো খাবার বা বিশেষ সাপ্লিমেন্টের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। পেয়ারা, ডাল, ছোলা, ওটস, বাদাম এবং বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজির মতো পরিচিত খাবার থেকেই শরীর প্রয়োজনীয় ফাইবার পেতে পারে।
কিন্তু আধুনিক খাদ্যাভ্যাসে পরিশোধিত চাল-আটা এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের আধিক্য থাকায় অনেকের খাবারে ফলমূল, শাকসবজি ও গোটা শস্যের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব ধীরে ধীরে হজমের স্বাভাবিক ছন্দ, মলত্যাগ এবং ক্ষুধার ওপর পড়তে পারে। যে ৫ লক্ষণে বুঝবেন ফাইবারের অভাব—
মলত্যাগ নিয়মিত না হওয়া কিংবা কয়েক দিন পরপর টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন হওয়া কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণ হতে পারে। খাদ্যে ফাইবারের পরিমাণ কম থাকলে এমন সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
ফাইবার মলের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে এবং অন্ত্রের মধ্য দিয়ে বর্জ্য পদার্থ সহজে বের হতে সহায়তা করে। তাই নিয়মিত মলত্যাগের অভ্যাস বজায় রাখতে পর্যাপ্ত ফাইবার গ্রহণ করা জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি তথ্য অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের বয়স ও লিঙ্গ অনুসারে প্রতিদিন প্রায় ২২ থেকে ৩৪ গ্রাম ফাইবার প্রয়োজন হতে পারে।
মল অতিরিক্ত শক্ত ও শুষ্ক হয়ে যাওয়া
মলত্যাগের সময় মল যদি শক্ত, শুকনো কিংবা ছোট ছোট দানার মতো বের হয়, তাহলে সেটি কোষ্ঠকাঠিন্যের ইঙ্গিত হতে পারে। খাদ্যে প্রয়োজনীয় ফাইবার না থাকাও এর অন্যতম সম্ভাব্য কারণ।
ফাইবার মলের মধ্যে পানি ধরে রাখতে এবং মলকে তুলনামূলক নরম রাখতে সহায়তা করে। ফলে মলত্যাগ সহজ হয় এবং অতিরিক্ত অস্বস্তি কমতে পারে।
মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ
টয়লেটে বসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা, মলত্যাগের জন্য বারবার জোর দেওয়া কিংবা প্রতিবারই কষ্ট অনুভব করা স্বাভাবিক বিষয় নয়।
খাবারে ফাইবার কম থাকলে মল শক্ত হয়ে যেতে পারে। এতে মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দিতে হয়। দীর্ঘদিন এমন অভ্যাস চলতে থাকলে পাইলস বা হেমোরয়েডের সমস্যা বাড়তে পারে। এমনকি ব্যথা ও রক্তপাতের মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে।
খাওয়ার পরপরই আবার ক্ষুধা লাগা
খাবার খাওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই যদি আবার ক্ষুধা অনুভব করেন, তাহলে আপনার খাবারের ধরনও একবার পর্যালোচনা করা উচিত।
পরিশোধিত শর্করাযুক্ত খাবার যেমন– সাদা ময়দার তৈরি খাবার বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার দ্রুত হজম হতে পারে। এসব খাবারে ফাইবার কম থাকায় দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকে না।
অন্যদিকে, ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার হজম হতে তুলনামূলক বেশি সময় নেয়। ফলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকার অনুভূতি বজায় থাকে।
এ সমস্যা কমাতে খাবারের তালিকায় ডাল, ছোলা, ওটস, শিমজাতীয় খাবার এবং আস্ত ফল রাখুন। সালাদের সঙ্গে ছোলা মিশিয়ে খেতে পারেন। ভাত বা রুটির সঙ্গে পর্যাপ্ত শাকসবজি রাখুন। বিকালের নাশতায় বিস্কুটের বদলে একটি ফল বেছে নেওয়াও ভালো অভ্যাস হতে পারে।
পেট ফাঁপা ও হজমের অস্বস্তি বারবার হওয়া
প্রায়ই পেট ফুলে থাকা, গ্যাস জমা কিংবা পেটে অস্বস্তি অনুভব করার পেছনেও খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা থাকতে পারে। বিশেষ করে ফাইবারের ঘাটতির কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিলে পেটে অস্বস্তি বাড়তে পারে।
ফাইবার শুধু মলত্যাগ স্বাভাবিক রাখতেই সাহায্য করে না, এটি অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এসব ব্যাকটেরিয়া নির্দিষ্ট ধরনের ফাইবার ভেঙে শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি করে, যা অন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
তবে ফাইবার গ্রহণের পরিমাণ বাড়াতে গিয়ে হঠাৎ অতিরিক্ত শিম, ডাল, কাঁচা শাকসবজি বা বীজ খাওয়া শুরু করা ঠিক নয়। দীর্ঘদিন কম ফাইবার খাওয়ার পর একবারে বেশি ফাইবার গ্রহণ করলে গ্যাস, পেট ফাঁপা কিংবা পেটে মোচড় দেওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই ধীরে ধীরে খাবারে ফাইবারের পরিমাণ বাড়ান এবং পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
মনে রাখবেন, কোষ্ঠকাঠিন্য বা পেটের অস্বস্তি হলেই যে ফাইবারের ঘাটতি রয়েছে, এমন নয়। এসব সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে, মলে রক্ত দেখা গেলে বা অকারণে ওজন কমতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬
নিয়ম মেনে প্রতিদিন তিন বেলা খাবার খাচ্ছেন, তারপরও কি হজমের সমস্যায় ভুগছেন? কখনো পেট ভার হয়ে থাকছে, কখনো মলত্যাগ করতে গিয়ে অস্বস্তি হচ্ছে। আবার দুপুরের খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই অনুভব করছেন ক্ষুধা। এমন পরিস্থিতিতে শুধু ভিটামিন বা খনিজের অভাবকে দায়ী করা ঠিক হবে না। বরং আপনার প্রতিদিনের খাবারে পর্যাপ্ত ফাইবার রয়েছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পুষ্টির কথা উঠলে সাধারণত প্রোটিন, ভিটামিন, ক্যালসিয়াম কিংবা আয়রনের গুরুত্ব নিয়েই বেশি আলোচনা হয়। কিন্তু শরীরের স্বাভাবিক হজম প্রক্রিয়া সচল রাখতে ফাইবারের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় এই উপাদানটির ঘাটতি দেখা দিলে কোষ্ঠকাঠিন্যসহ নানা ধরনের হজমজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ফাইবারের চাহিদা পূরণ করতে দামি কোনো খাবার বা বিশেষ সাপ্লিমেন্টের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। পেয়ারা, ডাল, ছোলা, ওটস, বাদাম এবং বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজির মতো পরিচিত খাবার থেকেই শরীর প্রয়োজনীয় ফাইবার পেতে পারে।
কিন্তু আধুনিক খাদ্যাভ্যাসে পরিশোধিত চাল-আটা এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের আধিক্য থাকায় অনেকের খাবারে ফলমূল, শাকসবজি ও গোটা শস্যের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব ধীরে ধীরে হজমের স্বাভাবিক ছন্দ, মলত্যাগ এবং ক্ষুধার ওপর পড়তে পারে। যে ৫ লক্ষণে বুঝবেন ফাইবারের অভাব—
মলত্যাগ নিয়মিত না হওয়া কিংবা কয়েক দিন পরপর টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন হওয়া কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণ হতে পারে। খাদ্যে ফাইবারের পরিমাণ কম থাকলে এমন সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
ফাইবার মলের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে এবং অন্ত্রের মধ্য দিয়ে বর্জ্য পদার্থ সহজে বের হতে সহায়তা করে। তাই নিয়মিত মলত্যাগের অভ্যাস বজায় রাখতে পর্যাপ্ত ফাইবার গ্রহণ করা জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি তথ্য অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের বয়স ও লিঙ্গ অনুসারে প্রতিদিন প্রায় ২২ থেকে ৩৪ গ্রাম ফাইবার প্রয়োজন হতে পারে।
মল অতিরিক্ত শক্ত ও শুষ্ক হয়ে যাওয়া
মলত্যাগের সময় মল যদি শক্ত, শুকনো কিংবা ছোট ছোট দানার মতো বের হয়, তাহলে সেটি কোষ্ঠকাঠিন্যের ইঙ্গিত হতে পারে। খাদ্যে প্রয়োজনীয় ফাইবার না থাকাও এর অন্যতম সম্ভাব্য কারণ।
ফাইবার মলের মধ্যে পানি ধরে রাখতে এবং মলকে তুলনামূলক নরম রাখতে সহায়তা করে। ফলে মলত্যাগ সহজ হয় এবং অতিরিক্ত অস্বস্তি কমতে পারে।
মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ
টয়লেটে বসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা, মলত্যাগের জন্য বারবার জোর দেওয়া কিংবা প্রতিবারই কষ্ট অনুভব করা স্বাভাবিক বিষয় নয়।
খাবারে ফাইবার কম থাকলে মল শক্ত হয়ে যেতে পারে। এতে মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দিতে হয়। দীর্ঘদিন এমন অভ্যাস চলতে থাকলে পাইলস বা হেমোরয়েডের সমস্যা বাড়তে পারে। এমনকি ব্যথা ও রক্তপাতের মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে।
খাওয়ার পরপরই আবার ক্ষুধা লাগা
খাবার খাওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই যদি আবার ক্ষুধা অনুভব করেন, তাহলে আপনার খাবারের ধরনও একবার পর্যালোচনা করা উচিত।
পরিশোধিত শর্করাযুক্ত খাবার যেমন– সাদা ময়দার তৈরি খাবার বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার দ্রুত হজম হতে পারে। এসব খাবারে ফাইবার কম থাকায় দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকে না।
অন্যদিকে, ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার হজম হতে তুলনামূলক বেশি সময় নেয়। ফলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকার অনুভূতি বজায় থাকে।
এ সমস্যা কমাতে খাবারের তালিকায় ডাল, ছোলা, ওটস, শিমজাতীয় খাবার এবং আস্ত ফল রাখুন। সালাদের সঙ্গে ছোলা মিশিয়ে খেতে পারেন। ভাত বা রুটির সঙ্গে পর্যাপ্ত শাকসবজি রাখুন। বিকালের নাশতায় বিস্কুটের বদলে একটি ফল বেছে নেওয়াও ভালো অভ্যাস হতে পারে।
পেট ফাঁপা ও হজমের অস্বস্তি বারবার হওয়া
প্রায়ই পেট ফুলে থাকা, গ্যাস জমা কিংবা পেটে অস্বস্তি অনুভব করার পেছনেও খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা থাকতে পারে। বিশেষ করে ফাইবারের ঘাটতির কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিলে পেটে অস্বস্তি বাড়তে পারে।
ফাইবার শুধু মলত্যাগ স্বাভাবিক রাখতেই সাহায্য করে না, এটি অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এসব ব্যাকটেরিয়া নির্দিষ্ট ধরনের ফাইবার ভেঙে শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি করে, যা অন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
তবে ফাইবার গ্রহণের পরিমাণ বাড়াতে গিয়ে হঠাৎ অতিরিক্ত শিম, ডাল, কাঁচা শাকসবজি বা বীজ খাওয়া শুরু করা ঠিক নয়। দীর্ঘদিন কম ফাইবার খাওয়ার পর একবারে বেশি ফাইবার গ্রহণ করলে গ্যাস, পেট ফাঁপা কিংবা পেটে মোচড় দেওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই ধীরে ধীরে খাবারে ফাইবারের পরিমাণ বাড়ান এবং পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
মনে রাখবেন, কোষ্ঠকাঠিন্য বা পেটের অস্বস্তি হলেই যে ফাইবারের ঘাটতি রয়েছে, এমন নয়। এসব সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে, মলে রক্ত দেখা গেলে বা অকারণে ওজন কমতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

মতামত