বাঙালির বাংলাদেশ
প্রকাশ : রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

তালাবদ্ধ-বিদ্যুৎহীন ‘শান্তি নিবাস’, মেলেনি অসহায় প্রবীণদের ঠাঁই

তালাবদ্ধ-বিদ্যুৎহীন ‘শান্তি নিবাস’, মেলেনি অসহায় প্রবীণদের ঠাঁই

জীবনের শেষ বেলায় অসহায়, অবহেলিত ও আশ্রয়হীন প্রবীণ নারীদের নিরাপদ ঠিকানা হওয়ার কথা ছিল লালমনিরহাটের শান্তি নিবাস। ৬০ বছরের বেশি বয়সের ২৫ জন নারীর বাসস্থান, চিকিৎসা ও নিশ্চিত জীবনের প্রত্যাশা নিয়ে ৮ কোটি টাকারও বেশি ব্যায়ে নির্মিত হয়েছিল এই শান্তি নিবাস। কিন্তু এখনো তালাবদ্ধ ও বিদ্যুৎহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। যেন স্বপ্নের আশ্রয় হয়েছে নিঃসঙ্গ এই ভবনে।

কেন্দ্রটি ​হস্তান্তরের প্রায় তিন বছর অতিবাহিত হলেও এর দরজা খোলা হয়নি কোনো প্রবীণ মায়ের জন্য। জনবল সংকটের অজুহাতে তালাবদ্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে ভবনটি, এদিকে বকেয়া বিলের দায়ে বিচ্ছিন্ন হয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ। অযত্ন আর অবহেলায় নষ্ট হতে বসেছে কোটি টাকার জিনিসপত্র। বর্তমানে ভবনটির আনুষ্ঠানিক দেখভালের জন্য নেই কারও দায়িত্ব। লালমনিরহাট সরকারি শিশু পরিবারের কর্তৃপক্ষ কেবল মানবিক কারণে এটি নজরে রাখছেন।

লালমনিরহাট সরকারি শিশু পরিবারের উপতত্ত্বাবধায়ক মোসাম্মৎ হাওয়া খাতুন জানান, কবে নাগাদ এই ভবনটি চালু হবে, সেটি আমি বলতে পারব না। এটির আনুষ্ঠানিকভাবে দেখভালের দায়িত্বও আমাদের কাছে নেই। তবে যেহেতু আমাদের প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই ভবনটি অবস্থিত, তাই আমি নিজ দায়িত্বে এটির দেখাশোনা করি মাত্র। ভেতরের জিনিসপত্র এখনো মোটামুটি ভালো আছে। তবে বিদ্যুতের লাইন বিচ্ছিন্ন থাকায় রাতে ভবনটি ঘোর অন্ধকারে থাকে।

লালমনিরহাটের বালাটারি এলাকায় সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা) প্রাঙ্গণে ২০২২ সালের ১৬ আগস্ট শুরু হয় এই শান্তি নিবাসের নির্মাণকাজ। প্রায় ৮ কোটি ১ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন এই বহুতল ভবনটির কাজ শেষ হলে ২০২৩ সালের ৩০ আগস্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ভবনটি হস্তান্তর করা হয়।

​৬০ বছরের ওপরে বয়স, এমন ২৫ জন প্রবীণ নারীর জন্য এখানে আছে ২৫টি আধুনিক শয়নকক্ষ, উন্নত ডাইনিং, লিফট, শরীরচর্চার জন্য জিমনেসিয়াম এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম। কিন্তু হস্তান্তরের তিন বছর পরও ভবনটি চালু না হওয়ায় এসব দামি জিনিসপত্র অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হতে বসেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানান, বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রায় ৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা বকেয়া থাকায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। ফলে রাতে ঘোর অন্ধকারে ডুবে থাকে পুরো ভবনটি। এর পাশাপাশি লিফটের রক্ষণাবেক্ষণের চুক্তির মেয়াদও ইতোমধ্যে শেষ হওয়ার পথে। সরকারি অর্থে নির্মিত এমন একটি জনকল্যাণমূখী প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে রয়েছে চরম হতাশা ও ক্ষোভ।

শিক্ষক মাহফুজ রহমান বলেন, তিন বছর আগে শান্তি নিবাসের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রয়েছে সেখানে। যাদের জন্য এই আশ্রয়কেন্দ্র সেই প্রবীন নারীরাই সেখানে থাকার সুযোগ পাচ্ছে না এখনো। দ্রুত এর জনবল এবং অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধান করে জেলার অবহেলিত বৃদ্ধা মায়েদের থাকার সুযোগ করে দেওয়া হোক।

​সাংবাদিক খোরশেদ আলম সাগর বলেন, মহৎ উদ্দেশে প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। অথচ উদ্বোধনের পর থেকেই তালাবদ্ধ। ঘরের আসবাবপত্র ব্যবহার না করায় এসব নষ্ট হচ্ছে। বকেয়া বিলের কারণে বিদ্যুৎ সংযোগও নেই। এমন একটি প্রয়োজনীয় ভবনের এমন পরিণতি মেনে নেওয়া সত্যি কষ্টকর।

লালমনিরহাট ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম লিটন বলেন, লালমনিরহাটে শান্তি নিবাসটি চালু হওয়া খুবই প্রয়োজন। কারণ বর্তমান সময়ে পথেঘাটে অনেক বৃদ্ধাকে মানবেতর জীবনযাপন করতে দেখা যায়। শান্তি নিবাসটির প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোগত সমস্যা দূর করে পথেঘাটে পড়ে থাকা এসব বৃদ্ধার জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি। আর এর উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে। তা না হলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত শান্তি নিবাসটি কোনো কাজে আসবে না। এটি চালুর ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার অনুরোধ জানাচ্ছি।

লালমনিরহাটবাসীর একটাই চাওয়া, দ্রুতই খুলে দেওয়া হোক শান্তি নিবাসের বদ্ধ দরজা। এই নিঃশব্দ ভবনে জ্বলে উঠুক আলো। অসহায় অবহেলিত মায়েদের একাকীত্ব কেটে ফিরে পাক নিশ্চিত আশ্রয়, নিরাপত্তা ও শান্তির হাসি।

লালমনিরহাট জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক ফজলুল হক বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রকল্পের মাধ্যমে সারা দেশে এমন আটটি শান্তিনিবাস নির্মাণ করা হয়েছে, যার মধ্যে এটিও একটি।

তিনি আরও বলেন, ২০২৩ সালের জুন মাসে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয় এবং আমরা অবকাঠামো ও সরঞ্জামাদি বুঝে পাই। কিন্তু জনবলের পদ সৃষ্টি না হওয়ায় এর কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জনবল নিয়োগের অনুমোদন পাওয়া গিয়েছে এবং সেটির কার্যক্রমও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। নিয়োগ সম্পন্ন হলেই কর্তৃপক্ষের অনুমতি ক্রমে আমরা দ্রুত এটি চালু করতে পারবো।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

তালাবদ্ধ-বিদ্যুৎহীন ‘শান্তি নিবাস’, মেলেনি অসহায় প্রবীণদের ঠাঁই
0:00 0:00
1.0x
বাঙালির বাংলাদেশ

রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬


তালাবদ্ধ-বিদ্যুৎহীন ‘শান্তি নিবাস’, মেলেনি অসহায় প্রবীণদের ঠাঁই

প্রকাশের তারিখ : ০১ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

জীবনের শেষ বেলায় অসহায়, অবহেলিত ও আশ্রয়হীন প্রবীণ নারীদের নিরাপদ ঠিকানা হওয়ার কথা ছিল লালমনিরহাটের শান্তি নিবাস। ৬০ বছরের বেশি বয়সের ২৫ জন নারীর বাসস্থান, চিকিৎসা ও নিশ্চিত জীবনের প্রত্যাশা নিয়ে ৮ কোটি টাকারও বেশি ব্যায়ে নির্মিত হয়েছিল এই শান্তি নিবাস। কিন্তু এখনো তালাবদ্ধ ও বিদ্যুৎহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। যেন স্বপ্নের আশ্রয় হয়েছে নিঃসঙ্গ এই ভবনে।

কেন্দ্রটি ​হস্তান্তরের প্রায় তিন বছর অতিবাহিত হলেও এর দরজা খোলা হয়নি কোনো প্রবীণ মায়ের জন্য। জনবল সংকটের অজুহাতে তালাবদ্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে ভবনটি, এদিকে বকেয়া বিলের দায়ে বিচ্ছিন্ন হয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ। অযত্ন আর অবহেলায় নষ্ট হতে বসেছে কোটি টাকার জিনিসপত্র। বর্তমানে ভবনটির আনুষ্ঠানিক দেখভালের জন্য নেই কারও দায়িত্ব। লালমনিরহাট সরকারি শিশু পরিবারের কর্তৃপক্ষ কেবল মানবিক কারণে এটি নজরে রাখছেন।

লালমনিরহাট সরকারি শিশু পরিবারের উপতত্ত্বাবধায়ক মোসাম্মৎ হাওয়া খাতুন জানান, কবে নাগাদ এই ভবনটি চালু হবে, সেটি আমি বলতে পারব না। এটির আনুষ্ঠানিকভাবে দেখভালের দায়িত্বও আমাদের কাছে নেই। তবে যেহেতু আমাদের প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই ভবনটি অবস্থিত, তাই আমি নিজ দায়িত্বে এটির দেখাশোনা করি মাত্র। ভেতরের জিনিসপত্র এখনো মোটামুটি ভালো আছে। তবে বিদ্যুতের লাইন বিচ্ছিন্ন থাকায় রাতে ভবনটি ঘোর অন্ধকারে থাকে।

লালমনিরহাটের বালাটারি এলাকায় সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা) প্রাঙ্গণে ২০২২ সালের ১৬ আগস্ট শুরু হয় এই শান্তি নিবাসের নির্মাণকাজ। প্রায় ৮ কোটি ১ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন এই বহুতল ভবনটির কাজ শেষ হলে ২০২৩ সালের ৩০ আগস্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ভবনটি হস্তান্তর করা হয়।

​৬০ বছরের ওপরে বয়স, এমন ২৫ জন প্রবীণ নারীর জন্য এখানে আছে ২৫টি আধুনিক শয়নকক্ষ, উন্নত ডাইনিং, লিফট, শরীরচর্চার জন্য জিমনেসিয়াম এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম। কিন্তু হস্তান্তরের তিন বছর পরও ভবনটি চালু না হওয়ায় এসব দামি জিনিসপত্র অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হতে বসেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানান, বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রায় ৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা বকেয়া থাকায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। ফলে রাতে ঘোর অন্ধকারে ডুবে থাকে পুরো ভবনটি। এর পাশাপাশি লিফটের রক্ষণাবেক্ষণের চুক্তির মেয়াদও ইতোমধ্যে শেষ হওয়ার পথে। সরকারি অর্থে নির্মিত এমন একটি জনকল্যাণমূখী প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে রয়েছে চরম হতাশা ও ক্ষোভ।

শিক্ষক মাহফুজ রহমান বলেন, তিন বছর আগে শান্তি নিবাসের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রয়েছে সেখানে। যাদের জন্য এই আশ্রয়কেন্দ্র সেই প্রবীন নারীরাই সেখানে থাকার সুযোগ পাচ্ছে না এখনো। দ্রুত এর জনবল এবং অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধান করে জেলার অবহেলিত বৃদ্ধা মায়েদের থাকার সুযোগ করে দেওয়া হোক।

​সাংবাদিক খোরশেদ আলম সাগর বলেন, মহৎ উদ্দেশে প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। অথচ উদ্বোধনের পর থেকেই তালাবদ্ধ। ঘরের আসবাবপত্র ব্যবহার না করায় এসব নষ্ট হচ্ছে। বকেয়া বিলের কারণে বিদ্যুৎ সংযোগও নেই। এমন একটি প্রয়োজনীয় ভবনের এমন পরিণতি মেনে নেওয়া সত্যি কষ্টকর।

লালমনিরহাট ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম লিটন বলেন, লালমনিরহাটে শান্তি নিবাসটি চালু হওয়া খুবই প্রয়োজন। কারণ বর্তমান সময়ে পথেঘাটে অনেক বৃদ্ধাকে মানবেতর জীবনযাপন করতে দেখা যায়। শান্তি নিবাসটির প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোগত সমস্যা দূর করে পথেঘাটে পড়ে থাকা এসব বৃদ্ধার জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি। আর এর উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে। তা না হলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত শান্তি নিবাসটি কোনো কাজে আসবে না। এটি চালুর ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার অনুরোধ জানাচ্ছি।

লালমনিরহাটবাসীর একটাই চাওয়া, দ্রুতই খুলে দেওয়া হোক শান্তি নিবাসের বদ্ধ দরজা। এই নিঃশব্দ ভবনে জ্বলে উঠুক আলো। অসহায় অবহেলিত মায়েদের একাকীত্ব কেটে ফিরে পাক নিশ্চিত আশ্রয়, নিরাপত্তা ও শান্তির হাসি।

লালমনিরহাট জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক ফজলুল হক বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রকল্পের মাধ্যমে সারা দেশে এমন আটটি শান্তিনিবাস নির্মাণ করা হয়েছে, যার মধ্যে এটিও একটি।

তিনি আরও বলেন, ২০২৩ সালের জুন মাসে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয় এবং আমরা অবকাঠামো ও সরঞ্জামাদি বুঝে পাই। কিন্তু জনবলের পদ সৃষ্টি না হওয়ায় এর কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জনবল নিয়োগের অনুমোদন পাওয়া গিয়েছে এবং সেটির কার্যক্রমও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। নিয়োগ সম্পন্ন হলেই কর্তৃপক্ষের অনুমতি ক্রমে আমরা দ্রুত এটি চালু করতে পারবো।


বাঙালির বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মো: মনিরুজ্জামান (মনির)
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত