এক পা প্রায় অচল, অন্য পাও দুর্বল। মাটিতে কয়েক কদম হাঁটতেই ভর করতে হয় ক্র্যাচে। অথচ পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে সেই একরামুল হককেই প্রতিদিন উঠতে হয় গাছের মগডালে। কখনো ডাল কাটতে হয়, কখনো এক গাছ থেকে আরেক গাছে ঝুঁকি নিয়ে যেতে হয়। সামান্য আয়ের জন্য প্রতিনিয়ত জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছেন ৩২ বছর বয়সী এই যুবক।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার দক্ষিণ মধামোদন এলাকার আব্দুল করিমের ছেলে একরামুল হক। অচল পা আর সচল মনোবল নিয়ে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংগ্রাম করছেন তিনি। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার অজুহাতে ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে নেননি একরামুল। চলার পথ কঠিন হলেও দায়িত্ববোধ তাকে থামার সুযোগ দেয়নি।
পরিবার জানিয়েছে, সুস্থ ও সবল হাত-পা নিয়েই জন্ম নেন একরামুল। মাত্র ৪ বছর বয়সে তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হন তিনি। এরপর থেকে তার একটি পা দুর্বল হয়ে পড়ে, ধীরে ধীরে সেটি প্রায় অচল হয়ে যায়। এভাবেই কোনোমতে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন তিনি।
ছোটবেলায় সহপাঠী, প্রতিবেশী আর বন্ধুরা যখন লাফিয়ে লাফিয়ে সুপারিসহ নানা গাছে উঠত, তখন একরামুলের মনেও গাছে ওঠার প্রবল ইচ্ছা জাগত। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে সেই ইচ্ছা পূরণ করতে না পারার কষ্ট জমে ছিল মনে। সেই আক্ষেপই একসময় চেষ্টায় পরিণত হয়। এক পায়ে ভর করেই তিনি শিখে নেন গাছে ওঠার কৌশল। আর সেই দক্ষতাই এখন তার কাজ ও জীবিকার একমাত্র অবলম্বন।
একরামুলের আয়ের ওপর নির্ভরশীল ৬ সদস্যের পরিবার। তার বাবা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, বোন বিধবা। পরিবারের নানা দায়িত্বও এসে পড়েছে তার কাঁধে। তাই নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতার কথা ভুলে প্রতিদিন জীবিকার সন্ধানে বের হতে হয় তাকে। তার আয়েই সংসারে তিন বেলা খাবার জোটে।
একরামুল প্রতিদিন ক্র্যাচ হাতে গাছের কাছে যান। এরপর শুরু হয় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। কষ্ট করে গাছে উঠে ডালপালা কাটেন। কখনো এক গাছ থেকে আরেক গাছে যেতে হয়। মাটিতে হাঁটাই যেখানে কঠিন, সেখানে গাছের মগডালে উঠে কাজ করা তাঁর জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা চোখে না দেখলে বোঝার উপায় নেই।
ভয়, অজুহাত আর শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কাছে হার মানলে জীবনে কিছুই করা সম্ভব হতো না বলে মনে করেন একরামুল। তিনি বলেন, মানুষ বাঁচার জন্য লড়াই করে, সবাইকে নিয়ে একটু ভালো থাকার জন্যই এ যুদ্ধ।
একরামুল বলেন, শরীরের অনেক কষ্ট হয়। গাছে উঠতে ভয়ও লাগে। কিন্তু ভয়ের কাছে হার মেনে বসে থাকলে চলবে না। কাজ না করলে অভাবের সংসারে কারও মুখে হাসি থাকে না। মনে হয়, একদিন গাছপালা পরিষ্কারের কাজে না বের হলে চুলায় হাঁড়ি উঠবে না। একমুঠো ভাত আর কাপড়ের জন্যই তিনি এই ঝুঁকি নিয়ে গাছে উঠে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন বলে জানান।
ঝুঁকিপূর্ণ এই কাজ করে দিনে তার আয় হয় মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। কয়েক দিন আগেও গাছের ডাল কাটতে গিয়ে পড়ে আহত হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অর্থের অভাবে চিকিৎসা কিংবা বিশ্রামের সুযোগ হয়নি। বাবা-বোনসহ পরিবারের সদস্যদের খাবারের চিন্তায় পরদিনই আবার কাজে ফিরতে হয়েছে তাকে।
ক্র্যাচে ভর দিয়ে যে মানুষটির মাটিতে হাঁটাই কঠিন, অভাবের তাড়নায় তাকেই প্রতিদিন উঠতে হয় গাছের মগডালে। একটি দুর্ঘটনাই কেড়ে নিতে পারে তার জীবন। তবু পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে ঝুঁকি নিয়েই চলছে একরামুলের জীবনসংগ্রাম।
একরামুলের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বাবা আব্দুল করিম আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার তো চোখে অন্ধকার, নিজে তো কিছুই করতে পারি না। এই ছাওয়াটার (একরামুল) পাও নষ্ট। তারপরও পেটের দায়ে উয়াক প্রতিদিন গাছের মগডালে উঠতে হয়। বাপ হয়া সন্তানের এই কষ্টে বুক ফাটি যায়। যদি একটা স্থায়ী কিছু হইল হয়, তাইলে ছাওয়াটার এই মরণ ঝুঁকি নিয়া কষ্ট করা নাগিল না হয়।’
একরামুলের স্ত্রী হাসনা বানু বলেন, প্রতিদিন যখন ও বাড়ি থেকে বের হয়, না জানি কখন কোনো দুর্ঘটনা ঘটে সেই ভয়ে থাকি। কিন্তু উপায় নাই। কাজ না করলে রান্নাঘরে চুলা জ্বলে না। কাজের ওপর সংসারটা টিকে আছে।
প্রতিবেশী আমজাদ হোসেন বলেন, একরামুল খুব সৎ ও পরিশ্রমী ছেলে। প্রতিবন্ধিতাকে হার মানিয়ে সে সংসার চালানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু গাছের মগডালে ও যেভাবে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে, যেকোনো দিন বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা স্থানীয়ভাবে সাময়িক সহযোগিতা করলেও স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। সরকারের উচিত তার পাশে দাঁড়ানো।
একরামুল বলেন, আমি চাই একটা স্থায়ী কাজ। তাহলে আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাছে উঠতে হবে না। সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি আমার দিকে একটু এগিয়ে আসে, তাহলে আমার পরিবারটা বাঁচবে।
একরামুলের স্বপ্ন খুব বড় নয়—জীবনের ঝুঁকি ছাড়া একটি স্থায়ী কাজ, পরিবারের জন্য দুই বেলা খাবারের নিশ্চয়তা আর স্বজনদের মুখে হাসি। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের পথে প্রতিদিন তাকে লড়তে হচ্ছে নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে।
সারাই ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বাবুল মিয়া বলেন, এই কাজ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও একরামুল যা করে, তা অবাক করার মতো। আমরা তার পরিবারের জন্য রেশন কার্ড করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। একরামুল ও তার বাবা সরকারিভাবে প্রতিবন্ধী ভাতা পায়। আশা করছি, উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় তার জন্য একটা ঝুঁকিমুক্ত নিরাপদ কাজ কিংবা ছোট পরিসরে হলেও ব্যবসার ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬
এক পা প্রায় অচল, অন্য পাও দুর্বল। মাটিতে কয়েক কদম হাঁটতেই ভর করতে হয় ক্র্যাচে। অথচ পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে সেই একরামুল হককেই প্রতিদিন উঠতে হয় গাছের মগডালে। কখনো ডাল কাটতে হয়, কখনো এক গাছ থেকে আরেক গাছে ঝুঁকি নিয়ে যেতে হয়। সামান্য আয়ের জন্য প্রতিনিয়ত জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছেন ৩২ বছর বয়সী এই যুবক।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার দক্ষিণ মধামোদন এলাকার আব্দুল করিমের ছেলে একরামুল হক। অচল পা আর সচল মনোবল নিয়ে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংগ্রাম করছেন তিনি। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার অজুহাতে ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে নেননি একরামুল। চলার পথ কঠিন হলেও দায়িত্ববোধ তাকে থামার সুযোগ দেয়নি।
পরিবার জানিয়েছে, সুস্থ ও সবল হাত-পা নিয়েই জন্ম নেন একরামুল। মাত্র ৪ বছর বয়সে তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হন তিনি। এরপর থেকে তার একটি পা দুর্বল হয়ে পড়ে, ধীরে ধীরে সেটি প্রায় অচল হয়ে যায়। এভাবেই কোনোমতে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন তিনি।
ছোটবেলায় সহপাঠী, প্রতিবেশী আর বন্ধুরা যখন লাফিয়ে লাফিয়ে সুপারিসহ নানা গাছে উঠত, তখন একরামুলের মনেও গাছে ওঠার প্রবল ইচ্ছা জাগত। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে সেই ইচ্ছা পূরণ করতে না পারার কষ্ট জমে ছিল মনে। সেই আক্ষেপই একসময় চেষ্টায় পরিণত হয়। এক পায়ে ভর করেই তিনি শিখে নেন গাছে ওঠার কৌশল। আর সেই দক্ষতাই এখন তার কাজ ও জীবিকার একমাত্র অবলম্বন।
একরামুলের আয়ের ওপর নির্ভরশীল ৬ সদস্যের পরিবার। তার বাবা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, বোন বিধবা। পরিবারের নানা দায়িত্বও এসে পড়েছে তার কাঁধে। তাই নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতার কথা ভুলে প্রতিদিন জীবিকার সন্ধানে বের হতে হয় তাকে। তার আয়েই সংসারে তিন বেলা খাবার জোটে।
একরামুল প্রতিদিন ক্র্যাচ হাতে গাছের কাছে যান। এরপর শুরু হয় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। কষ্ট করে গাছে উঠে ডালপালা কাটেন। কখনো এক গাছ থেকে আরেক গাছে যেতে হয়। মাটিতে হাঁটাই যেখানে কঠিন, সেখানে গাছের মগডালে উঠে কাজ করা তাঁর জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা চোখে না দেখলে বোঝার উপায় নেই।
ভয়, অজুহাত আর শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কাছে হার মানলে জীবনে কিছুই করা সম্ভব হতো না বলে মনে করেন একরামুল। তিনি বলেন, মানুষ বাঁচার জন্য লড়াই করে, সবাইকে নিয়ে একটু ভালো থাকার জন্যই এ যুদ্ধ।
একরামুল বলেন, শরীরের অনেক কষ্ট হয়। গাছে উঠতে ভয়ও লাগে। কিন্তু ভয়ের কাছে হার মেনে বসে থাকলে চলবে না। কাজ না করলে অভাবের সংসারে কারও মুখে হাসি থাকে না। মনে হয়, একদিন গাছপালা পরিষ্কারের কাজে না বের হলে চুলায় হাঁড়ি উঠবে না। একমুঠো ভাত আর কাপড়ের জন্যই তিনি এই ঝুঁকি নিয়ে গাছে উঠে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন বলে জানান।
ঝুঁকিপূর্ণ এই কাজ করে দিনে তার আয় হয় মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। কয়েক দিন আগেও গাছের ডাল কাটতে গিয়ে পড়ে আহত হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অর্থের অভাবে চিকিৎসা কিংবা বিশ্রামের সুযোগ হয়নি। বাবা-বোনসহ পরিবারের সদস্যদের খাবারের চিন্তায় পরদিনই আবার কাজে ফিরতে হয়েছে তাকে।
ক্র্যাচে ভর দিয়ে যে মানুষটির মাটিতে হাঁটাই কঠিন, অভাবের তাড়নায় তাকেই প্রতিদিন উঠতে হয় গাছের মগডালে। একটি দুর্ঘটনাই কেড়ে নিতে পারে তার জীবন। তবু পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে ঝুঁকি নিয়েই চলছে একরামুলের জীবনসংগ্রাম।
একরামুলের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বাবা আব্দুল করিম আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার তো চোখে অন্ধকার, নিজে তো কিছুই করতে পারি না। এই ছাওয়াটার (একরামুল) পাও নষ্ট। তারপরও পেটের দায়ে উয়াক প্রতিদিন গাছের মগডালে উঠতে হয়। বাপ হয়া সন্তানের এই কষ্টে বুক ফাটি যায়। যদি একটা স্থায়ী কিছু হইল হয়, তাইলে ছাওয়াটার এই মরণ ঝুঁকি নিয়া কষ্ট করা নাগিল না হয়।’
একরামুলের স্ত্রী হাসনা বানু বলেন, প্রতিদিন যখন ও বাড়ি থেকে বের হয়, না জানি কখন কোনো দুর্ঘটনা ঘটে সেই ভয়ে থাকি। কিন্তু উপায় নাই। কাজ না করলে রান্নাঘরে চুলা জ্বলে না। কাজের ওপর সংসারটা টিকে আছে।
প্রতিবেশী আমজাদ হোসেন বলেন, একরামুল খুব সৎ ও পরিশ্রমী ছেলে। প্রতিবন্ধিতাকে হার মানিয়ে সে সংসার চালানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু গাছের মগডালে ও যেভাবে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে, যেকোনো দিন বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা স্থানীয়ভাবে সাময়িক সহযোগিতা করলেও স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। সরকারের উচিত তার পাশে দাঁড়ানো।
একরামুল বলেন, আমি চাই একটা স্থায়ী কাজ। তাহলে আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাছে উঠতে হবে না। সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি আমার দিকে একটু এগিয়ে আসে, তাহলে আমার পরিবারটা বাঁচবে।
একরামুলের স্বপ্ন খুব বড় নয়—জীবনের ঝুঁকি ছাড়া একটি স্থায়ী কাজ, পরিবারের জন্য দুই বেলা খাবারের নিশ্চয়তা আর স্বজনদের মুখে হাসি। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের পথে প্রতিদিন তাকে লড়তে হচ্ছে নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে।
সারাই ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বাবুল মিয়া বলেন, এই কাজ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও একরামুল যা করে, তা অবাক করার মতো। আমরা তার পরিবারের জন্য রেশন কার্ড করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। একরামুল ও তার বাবা সরকারিভাবে প্রতিবন্ধী ভাতা পায়। আশা করছি, উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় তার জন্য একটা ঝুঁকিমুক্ত নিরাপদ কাজ কিংবা ছোট পরিসরে হলেও ব্যবসার ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

মতামত